ঢাকা-৬ সংসদীয় আসনে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক হোসেন এবং জামায়াত-এ-ইসলামি প্রার্থী আব্দুল মান্নান একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন। উভয় প্রার্থীই নিজ নিজ দল থেকে পার্টি তালিকায় নাম নিবন্ধন করে ভোটের লড়াইয়ে নামেছেন। ইশরাক হোসেনের প্রধান লক্ষ্য হল তার পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে পুনরায় সংসদে ফিরিয়ে আনা, আর মান্নান প্রথমবারের মতো ভোটের রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক এলাকায় রাজনৈতিক গতিবিধি নতুন মোড় নিতে পারে।
ইশরাক হোসেন বর্তমানে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন এবং ঢাকা-৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তিনি প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে রাজনৈতিক মঞ্চে পা বাড়িয়েছেন। তার প্রচারণা মূলত নিরাপত্তা, চুরি-ছিনতাই এবং মাদক সমস্যার ওপর কেন্দ্রীভূত, যা তিনি স্থানীয় জনগণের প্রধান উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরছেন।
ইশরাকের পিতা সাদেক হোসেন খোকা, পুরনো ঢাকার এক সময়ের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, যিনি ঢাকা অবিভক্ত সিটি কর্পোরেশনের শেষ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চারবার সংসদ সদস্য এবং দুবার মন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ইশরাকের নির্বাচনী কৌশলকে শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করছে।
ইশরাক হোসেনের বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয় এবং পুরনো ঢাকার সন্তান হওয়ার গর্বকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তিনি উচ্চ আদালতের রায় পেয়ে হলেও মেয়রের চেয়ারে বসতে পারেননি, তাই এবার সংসদে প্রবেশের লক্ষ্যে প্রচার চালাচ্ছেন। তার প্রচারণা দলীয় সমর্থন এবং স্থানীয় সংগঠনের সহায়তায় গড়ে উঠছে।
অন্যদিকে জামায়াত-এ-ইসলামির প্রার্থী আব্দুল মান্নান পুরনো ঢাকার ঘরোয়া রাজনীতিতে পরিচিত হলেও ভোটের রাজনীতিতে নতুন মুখ। তিনি ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগরী পশ্চিম শাখা এবং কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে কাজ করেছেন। শিবিরের নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাকে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।
মান্নান বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত এবং এই পেশাগত পটভূমি তাকে শিক্ষাবিষয়ক নীতি নিয়ে ভোটারদের কাছে কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে। তিনি দল, জোট এবং প্রতীকের ব্যবহারকে ভোটের হিসাবের মূল উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জামায়াত-এ-ইসলামি ২৯ বছর পর এই আসনে প্রার্থী দাখিল করেছে, যা পার্টির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ঢাকা-৬ আসনটি পুরনো ঢাকার ৩৪, ৩৭ থেকে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে, যার মধ্যে সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, ওয়ারি এবং কোতোয়ালি ও বংশালার কিছু অংশ রয়েছে। এই এলাকাগুলি ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং ভোটার ঘনত্ব বেশি। নির্বাচনী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ২,৯২,২৮৩, যার মধ্যে পোস্টাল ব্যালটের জন্য নিবন্ধিত ভোটার ২,৮৬৭।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকায় গণ ফ্রন্টের আহম্মেদ আলী শেখ (মাছ), বাংলাদেশ কংগ্রেসের ইউনুস আলী আকন্দ (ডাব), বাংলাদেশ মুসলিম লীগের আকতার হোসেন (হারিকেন) এবং জাতীয় পার্টির আমির উদ্দিন আহমেদ ডালু (লাঙ্গল) অন্তর্ভুক্ত। এই প্রার্থীরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দলের প্রতীক ব্যবহার করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
গণ অধিকার পরিষদের (জিওপি) প্রার্থী ফখরুল ইসলাম, যাকে ট্রাক প্রতীক দেওয়া হয়েছে, তিনি ইশরাক হোসেনকে সমর্থন করে ভোট থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তবে সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ায় তার নাম এখনও ব্যালটে থাকবে। এই সিদ্ধান্ত কিছু ভোটারকে বিভ্রান্ত করতে পারে, তবে পার্টি তার সমর্থন বজায় রাখতে চায়।
সূত্রাপুরের ধূপখোলা মাঠের পাশে বসবাসকারী রিয়াজ উদ্দিন নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী নন। তিনি স্থানীয় নিরাপত্তা ও সেবা সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভোটের ফলাফলকে নির্ধারক হিসেবে দেখছেন না। তার মতামত অন্যান্য ভোটারদের মধ্যে সাধারণত শেয়ার করা হয়।
এই নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা পুরনো ঢাকার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন দিক উন্মোচন করতে পারে। যদি ইশরাক হোসেন জয়লাভ করেন, তবে তার পরিবার আবার সংসদে ফিরে আসবে, যা তার পিতার রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করবে। অন্যদিকে, যদি আব্দুল মান্নান জয়ী হন, তবে জামায়াত-এ-ইসলামি দীর্ঘ সময়ের পর আবার সংসদে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হওয়ার পর উভয় দলই ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য অতিরিক্ত প্রচেষ্টা চালাবে, এবং আসনের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি নেবে। এই ধাপটি স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় নীতির সঙ্গে সমন্বয় করে এলাকার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে।



