চট্টগ্রাম বন্দর কর্মীরা তৃতীয় দিন ধারাবাহিকভাবে আট ঘণ্টার কাজবিরতি বজায় রেখেছে। কর্মবিরতির মূল দাবি হল নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT)কে সংযুক্ত আরব আমিরাতের DP World-কে লিজে দেওয়ার পরিকল্পনা রোধ করা। কর্মসূচি আজও চালু থাকবে, যদিও বিকেল চারটার পর থেকে জাহাজ থেকে পণ্য ও কন্টেইনার লোড‑অনলোডের কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে।
কর্মবিরতির পেছনে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়বাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইব্রাহিম খোকানের নেতৃত্বে গৃহীত আট ঘণ্টার কাজবিরতি প্রোগ্রাম। তিনি জানান, সরকার NCT-কে বিদেশি অপারেটরের হাতে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
বিকেল চারটার পর থেকে জাহাজ থেকে পণ্য ও কন্টেইনারের লোড‑অনলোড, পাশাপাশি বন্দরইয়ার্ড থেকে পণ্য সরবরাহের কাজ সম্পূর্ণ গতিতে পুনরায় চালু হয়েছে। তবে বন্দর পরিচালনা সমিতির সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী সতর্ক করেছেন, যদি বিরোধ দীর্ঘায়িত হয় তবে ইয়ার্ডে গুছিয়ে রাখার ঝুঁকি বাড়বে।
চৌধুরী সমিতির সদস্যরা জোর দিয়ে বলেছেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে অচল করে না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা উচিত। তিনি সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষকে একত্রে বসে সমঝোতা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বন্দরের কর্তৃপক্ষ ও সরকার এখনও কর্মীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা শুরু করেনি, এ বিষয়ে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়কারী মোঃ হুমায়ুন কবির মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, কর্মসূচি চালু থাকা সত্ত্বেও কোনো সমঝোতার দরজা খোলা হয়নি।
প্রশাসনিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে স্থানান্তর ও স্ট্যান্ডবাই করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে শ্রমিক সংগঠনগুলো কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে সমালোচনা করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গতকাল আরও সাতজন কর্মচারীকে পাঙ্গাঁও ইনল্যান্ড কন্টেইনার টার্মিনাল (ICD) ও কামালাপুর ICD-তে স্থানান্তর করেছে। স্থানান্তরিত কর্মীরা কাজবিরতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছিলেন, তাই এই পদক্ষেপকে কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়ানোর প্রচেষ্টা বলা হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু যুব আর্থনীতিবিদ ফোরাম, একটি দাতব্য সংস্থা, সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জাজের সামনে নতুন পিটিশন দায়ের করেছে। পিটিশনটি উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের জন্য লীভ টু আপিল দাখিল না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ চায়।
ফোরামের পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় সংসদীয় নির্বাচন নিকটবর্তী এবং এমন সংবেদনশীল সময়ে বিতর্কিত চুক্তি কার্যকর করা নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা এই চুক্তিকে স্বৈরাচারী ও অনৈতিক পদক্ষেপ বলে সমালোচনা করেছে।
বন্দরের কাজবিরতি যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে দেশের রপ্তানি-আমদানি প্রবাহে উল্লেখযোগ্য বাধা সৃষ্টি হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে প্রতি বছর লক্ষ কোটি ডলারের পণ্য চলাচল করে; যেকোনো ধীরগতি সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটাবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি বিরোধ সমাধান না হয় তবে বন্দরইয়ার্ডে কন্টেইনারের জমা বাড়বে এবং শিপিং লাইনগুলো বিকল্প বন্দর ব্যবহার করতে বাধ্য হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের বাণিজ্যিক খরচ বাড়িয়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বন্দরের কর্মবিরতি, শ্রমিক সংগঠন ও সরকারী পক্ষের মধ্যে সমঝোতার অভাব, এবং উচ্চ আদালতের রায়ের পরবর্তী আইনি চ্যালেঞ্জ সবই একসাথে দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এখনই উভয় পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা বাণিজ্যিক ক্ষতি রোধের একমাত্র উপায় বলে মনে হচ্ছে।



