চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এ কর্মরত ১৫ জন কর্মচারীকে আজ (২ ফেব্রুয়ারি) জাহাজ মন্ত্রণালয়ের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আদেশে খুলনার মোংলা বন্দর ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। বদলির মধ্যে আন্দোলনের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করা দুইজন কর্মীও অন্তর্ভুক্ত।
বদলির আদেশ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. বেলায়েত হোসেনের স্বাক্ষরে প্রকাশিত হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাপ্তরিক প্রয়োজনীয়তা অনুসারে বদলিপূর্বক সংযুক্তি প্রদান করা হবে। মোট আটজন কর্মীকে পায়রা বন্দরে এবং সাতজনকে মোংলা বন্দরে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই বদলির আগে একই কর্মচারীদের তিনটি পৃথক আদেশে ঢাকা কমলাপুর কনটেইনার ডিপো ও কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তবে তারা ঐ স্থানে যোগ দেননি। ফলে আজ আবারও দু’টি বন্দরকে নতুন সংযুক্তি হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে।
কর্মচারীরা গত শনিবার থেকে আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে আসছেন, যা এনসিটি ইজারার প্রতিবাদে ডিপি ওয়ার্ল্ড (সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি) কে লিজ প্রদান করার সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধে। আন্দোলনের তৃতীয় দিন আজও সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্দর কার্যক্রমে অচলাবস্থা রয়ে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ আগামীকাল থেকে একটানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
বদলির মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবিরকে মোংলা বন্দরে এবং সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকনকে পায়রা বন্দরে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যান্য বদলিপ্রাপ্ত কর্মচারীর তালিকায় মো. ফরিদুর রহমান, মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, রাশিদুল ইসলাম, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. জহিরুল ইসলাম, খন্দকার মাসুদুজ্জামান, মো. হুমায়ুন কবির, মো. শাকিল রায়হান, মানিক মিঝি, মো. শামসু মিয়া, মো. লিয়াকত আলী, আমিনুর রসুল বুলবুল ও মো. রাব্বানী অন্তর্ভুক্ত।
বন্দরের কার্যক্রমে দীর্ঘ সময়ের অচলাবস্থা শিপিং কোম্পানি ও লজিস্টিক সেবার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের লিজ চুক্তি রপ্তানি-আমদানি প্রবাহে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করলেও, কর্মী বিরোধের ফলে পোর্টের টার্নওভার হ্রাস, জাহাজের অপেক্ষার সময় বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত ব্যয় দেখা দিতে পারে। এই পরিস্থিতি শিপিং লাইন ও কার্গো এজেন্টদের বিকল্প বন্দর ব্যবহার বা রুট পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যিক ব্যয় বাড়াবে।
বদলির ফলে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের প্রতিবাদকে তীব্র করার সংকেত দিয়েছে। সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকনের মতে, বদলির উদ্দেশ্য আন্দোলনের গতি কমানো হলেও, ইজারা বাতিলের পাশাপাশি বদলির বিরোধে কর্মসূচি আরও বেগবান করা হবে। এই ঘোষণার পর বন্দর ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও অপারেশনাল পরিকল্পনা চাওয়া হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন যে, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান রপ্তানি-আমদানি হাব, এবং দীর্ঘমেয়াদী কর্মবিরতি বা অতিরিক্ত বদলি প্রক্রিয়া শিপিং ফি বৃদ্ধি, পণ্যের ডেলিভারি সময় বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের লিজ চুক্তি রদ বা পুনর্বিবেচনা হলে, সরকারকে বিকল্প বিনিয়োগকারী বা স্থানীয় অংশীদারিত্বের দিকে নজর দিতে হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান বদলি ও শ্রমবিরতি চট্টগ্রাম বন্দরকে স্বল্পমেয়াদে অস্থির অবস্থায় রাখবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে লিজ নীতির স্বচ্ছতা, কর্মী অধিকার ও বাণিজ্যিক স্বার্থের সমন্বয় কীভাবে করা হবে, তা দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা নীতির মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যাবে।



