রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (IFFR) 55তম সংস্করণে সোমবার “আরব সিনেমা ইন মোশন” শিরোনামের একটি প্যানেল অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলজেরিয়ার পরিচালক মালেক বেনস্মাইল, লেবাননের মেরি-রোজ ওস্তা এবং মিশরের মারওয়ান হামেদ অংশ নেন। হামেদ এই বছর উৎসবের রেট্রোস্পেকটিভে কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
প্যানেলটি আরব বিশ্বের চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়। IFFR 2026-এ নির্বাচিত চলচ্চিত্র নির্মাতারা এবং শিল্পের বিশেষজ্ঞরা একত্রে বিভিন্ন আরব দেশের উৎপাদন পদ্ধতি, বড় বাজেটের বাণিজ্যিক ছবি থেকে স্বাধীন চলচ্চিত্র পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয় আলোচনা করেন।
আলোচনার মূল বিষয় ছিল আর্থিক সহায়তার পরিবর্তনশীল ধারা। ঐতিহ্যগতভাবে সরকারী অনুদান ও স্থানীয় বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল শিল্প এখন আন্তর্জাতিক সহ-উৎপাদন ও ইউরোপীয় পার্টনারশিপের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তনটি বিশেষ করে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রভাবও আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। হামেদ উল্লেখ করেন যে বর্তমানে একটি চলচ্চিত্রের আয়ের অর্ধেকের বেশি স্ট্রিমিং থেকে আসে। তিনি যুক্তি দেন যে অনলাইন বিতরণ চলচ্চিত্রের জীবদ্দশা বাড়িয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর পথ সহজ করে।
ওস্তা তার নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি বলেন, স্ট্রিমিংয়ের আগমনের আগে তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন, ফলে তিনি আমেরিকান স্টুডিওর সরাসরি প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত ছিলেন। তিনি ইউরোপের সঙ্গে যৌথ উৎপাদন এবং ঘরে বসে বন্ধুদের সঙ্গে সৃজনশীল সহযোগিতা করার সম্ভাবনা উল্লেখ করেন।
তবে ওস্তা স্বীকার করেন যে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের উত্থান শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, বড় স্টুডিওগুলো এখন সরাসরি দর্শকের ঘরে প্রবেশ করে এবং তাদের কন্টেন্টের মাধ্যমে স্থানীয় বাজারকে প্রভাবিত করছে। এই পরিস্থিতি আরব চলচ্চিত্রের স্বতন্ত্রতা ও সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
প্যানেলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আরব চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান। অংশগ্রহণকারীরা উল্লেখ করেন যে স্ট্রিমিং সেবা বিশ্বব্যাপী দর্শকের কাছে আরব গল্প পৌঁছানোর নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে গ্লোবাল স্টুডিওর কন্টেন্ট নীতি স্থানীয় সৃজনশীলতাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে।
বিনোদন শিল্পের আর্থিক কাঠামো পরিবর্তনের ফলে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য তহবিল সংগ্রহের পদ্ধতিও বদলে গেছে। এখন ফান্ডিং প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক গ্রান্ট, কো-প্রোডাকশন চুক্তি এবং ব্যক্তিগত বিনিয়োগের ভূমিকা বাড়ছে। এই পরিবর্তনটি বিশেষ করে তরুণ পরিচালকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
প্যানেলটি শেষের দিকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের নৈতিক দিক নিয়ে আলোচনা করে। অংশগ্রহণকারীরা জোর দেন যে প্ল্যাটফর্মগুলোকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মানকে সম্মান করে কন্টেন্ট প্রদান করতে হবে, নতুবা দর্শকের বিশ্বাস হারানোর ঝুঁকি থাকে।
মালেক বেনস্মাইল আরব সিনেমার বৈচিত্র্য ও তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আরব দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়লে উৎপাদন মান উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও বেশি স্বীকৃতি পাবে।
প্যানেলটি IFFR প্রো প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, যা শিল্পের পেশাদারদের জন্য নেটওয়ার্কিং এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ প্রদান করে। অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য কৌশল নির্ধারণের পরিকল্পনা করেন।
সারসংক্ষেপে, রটারড্যাম চলচ্চিত্র উৎসবে আরব সিনেমার বর্তমান অবস্থা, তহবিলের নতুন পথ এবং স্ট্রিমিংয়ের দ্বৈত প্রভাব নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা সম্মত হন যে শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায়সঙ্গত ফান্ডিং এবং সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা জরুরি।
এই প্যানেলটি আরব চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তারা নিজেদের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগগুলোকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় এবং স্থানীয় শিল্পের স্বতন্ত্রতা রক্ষার জন্য নীতি নির্ধারণে এই ধরনের আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে।



