লন্ডনের লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে (LSE) ডিএসসি প্রাইজের সাউথ এশিয়ান লিটারেচার শর্টলিস্ট ইভেন্টের পর একটি সন্ধ্যায় মার্ক টালির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর পুরনো ভবনের করিডোরে হালকা ফিসফিসে কথোপকথন চলছিল, তখনই প্রফেসর সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আমাকে টালির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কোনো আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান না থাকলেও তিনি হেসে হাত মেলিয়ে একটি সহজ প্রশ্ন করেন, যা আমাদের আলাপের সূচনা করে।
সেই মুহূর্তে আমি টালির পরিচয়কে একটি নামের মতোই অনুভব করলাম, যদিও আমি তার সঙ্গে কখনো মুখোমুখি হইনি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর আমি জন্মগ্রহণ করেছি, তাই যুদ্ধের সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকলেও বই, পরিবারিক কথোপকথন এবং শোনার ইচ্ছা না থাকা লোকদের নীরবতা থেকে ঐতিহাসিক তথ্য শিখেছি। রেডিওতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের খবর শোনার অভ্যাস আমার ছিল না, তবু টালির নাম প্রায়ই গম্ভীর স্বরে শোনা যেত, যেন সত্যের রক্ষক হিসেবে তার কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিত।
মার্ক টালি বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোর প্রধান হিসেবে বহু বছর কাজ করেছেন। তার প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্বে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এই সময়ে তিনি ব্রিটিশ রাজা থেকে নাইটের উপাধি পেয়েছেন এবং ভারতের সরকার থেকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাছাড়া তিনি বাফ্টা পুরস্কার এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিদেশি বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে টালি নিজের সম্পর্কে বেশি কথা বলতে চাননি। তার ক্যারিয়ার ও পুরস্কারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলোচনার অংশ হয়ে উঠলেও তিনি তা স্বাভাবিকভাবে উল্লেখ করেননি। পরিবর্তে, আমি যখন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা তুললাম, তখনই তার মুখে একটি শান্ত ও গম্ভীর ভাব প্রকাশ পেল। তিনি যুদ্ধের সময়ের ঘটনাবলী, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বিদেশি সমর্থনের গুরুত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে ব্যাখ্যা করেন।
টালি উল্লেখ করেন যে, যুদ্ধের সময় বিবিসি বিশ্বসেবার সাংবাদিকরা সীমিত তথ্যের মধ্যে সত্যকে তুলে ধরতে কঠোর পরিশ্রম করেছিল। তথ্যের ঘাটতি, সেন্সরশিপ এবং যুদ্ধের ধ্বংসের মাঝেও তারা মানবিক কাহিনীকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা তার পরবর্তী বছরগুলোতে সাংবাদিকতার নীতি ও নৈতিকতার ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে।
লেখক হিসেবে টালির কাজের বৈশিষ্ট্য হল সরলতা ও নির্ভুলতা। তিনি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারতেন, যা পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ছিল। তার বই ও রচনাগুলোতে তিনি প্রায়ই ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ স্থাপন করে দেখিয়েছেন, যাতে নতুন প্রজন্মের মানুষ অতীতের শিক্ষা থেকে উপকৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে টালির অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সত্যিকারের বর্ণনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা ইতিহাসের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি পায়। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাধারা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
টালির সঙ্গে আলাপের সময় তিনি বলেন, সত্যের অনুসন্ধান কখনো শেষ হয় না; তা ধারাবাহিকভাবে পুনর্মূল্যায়ন ও যাচাই করা দরকার। তিনি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন যে, তথ্যের উৎস যাচাই করে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে তারা নিজেদের মত গঠন করবে। এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে ভুল তথ্যের প্রভাব কমাতে সহায়তা করবে।
মার্ক টালি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিদেশি বন্ধু হিসেবে স্বীকৃত হওয়ার কারণ হল, তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে বাংলাদেশের সংগ্রামকে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার প্রতিবেদনগুলোতে যুদ্ধের মানবিক দিক, শরণার্থীর অবস্থা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। এই তথ্যগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনের কাজকে সমর্থন করেছে।
টালির ক্যারিয়ার থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, সাংবাদিকতা শুধুমাত্র খবর জানানো নয়, বরং সত্যের রক্ষক হিসেবে কাজ করা। তিনি নিজের কাজকে “সত্যের সেবা” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, সাংবাদিকের দায়িত্ব হল সমাজের ন্যায়বিচার রক্ষায় তথ্য সরবরাহ করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আদর্শ হতে পারে।
সাক্ষাৎকারের শেষে টালি একবার বলেছিলেন, “ইতিহাসের স্মৃতি ও সত্যের সন্ধান একসাথে চলতে হবে”। তিনি যুক্তি দেন যে, স্মৃতি শুধুমাত্র অতীতের ঘটনা নয়, বরং বর্তমানের নীতি-নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতিহাসের পাঠকে জীবন্ত করে তোলা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থীরা তা থেকে বাস্তবিক শিক্ষা নিতে পারে।
এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দেখা যায়, টালি ব্যক্তিগতভাবে গর্বিত না হয়ে তার অর্জনগুলোকে সমাজের সেবা হিসেবে দেখেন। তিনি তার পুরস্কার ও সম্মাননা সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করলেও তা আলাপের মূল বিষয় নয়; বরং তার কাজের প্রভাব ও শিক্ষার দিকই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
শিক্ষা বিভাগের দৃষ্টিকোণ থেকে টালির অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায়, পাঠ্যক্রমে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ভূমিকা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের সত্যিকারের বর্ণনা অন্তর্ভুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবে, তখন তারা ইতিহাসের গভীরতা ও বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতা উভয়ই বুঝতে পারবে।
অবশেষে, শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ব্যবহারিক পরামর্শ: যখন কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে গবেষণা করবেন, তখন একাধিক আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন, মূল নথিপত্র ও সাক্ষাৎকারের রেকর্ড যাচাই করুন, এবং নিজের বিশ্লেষণ যোগ করে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলুন। এই পদ্ধতি সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে সহায়তা করবে।



