চট্টগ্রাম বন্দর কর্মী ও কর্মচারীরা মঙ্গলবার থেকে ২৪ ঘণ্টা কাজ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাদের মূল দাবি হল সরকার কর্তৃক নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) দুবাই ভিত্তিক আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী ডিপ ওয়ার্ল্ডকে লিজে দেওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করা।
বক্তব্যটি আজ দুপুর ১২:৪৫ টায় চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত প্রেসব্রিফিং-এ প্রকাশিত হয়। পোর্ট প্রোটেকশন মুভমেন্ট কাউন্সিলের সমন্বয়কারী ইব্রাহিম খোকন জানান, কর্মীরা মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে এক দিনব্যাপী ধর্মঘট পালন করবে।
একই সময়ে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতারা আগ্রাবাদে একটি সমাবেশে জানিয়েছেন, তারা বন্দর জেটির প্রবেশদ্বারগুলোকে মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখবে। এই পদক্ষেপটি লিজ চুক্তির বিরোধী প্রতিবাদকে তীব্র করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
বন্দরের কর্মীরা ইতিমধ্যে সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত তৃতীয় ধারাবাহিক দিন পূর্ণ ধর্মঘট চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একই সময়সূচি শনিবার ও রবিবারেও অনুসরণ করা হয়েছিল, ফলে বন্দর কার্যক্রমে ধারাবাহিক ব্যাঘাত দেখা গিয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক বিভাগ কর্মীদের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও ব্যবহারকারীদেরকে গুজবের প্রভাব না নিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়। তবে বাস্তবে শ্রমিকদের অনুপস্থিতি ও কাজের বন্ধের ফলে বন্দর কার্যক্রম প্রায় সম্পূর্ণভাবে থেমে গেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফজলে একরাম চৌধুরী জানান, শ্রমিকদের বুকিং করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তারা কাজ নিতে অস্বীকার করেছে। ফলে প্রশাসনিক কাজগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, কোনো নথি স্বাক্ষর হয় না এবং বন্দর সম্পূর্ণ স্থবির অবস্থায় রয়েছে।
কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, NCT লিজের বিরোধে ধারাবাহিক ধর্মঘটের ফলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং, পণ্য লোডিং ও আনলোডিং এবং জাহাজের চলাচল সবই গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই ব্যাঘাতের ফলে আমদানি পণ্যের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ধীর হয়ে গেছে এবং রপ্তানি পণ্যও বন্দরেই আটকে রয়েছে।
বন্দরের লজিস্টিক চেইনে এই ধরণের ব্যাঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট। পণ্য পরিবহন সময়সীমা বাড়ে, শিপিং কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত খরচ বেড়ে যায় এবং রপ্তানি-আমদানি ব্যবসায়ীর লাভের মার্জিন সংকুচিত হয়। এছাড়া, বন্দর ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলোকে বিকল্প রুট বা বন্দর ব্যবহার করতে বাধ্য হতে পারে, যা অতিরিক্ত লজিস্টিক খরচের দিকে নিয়ে যায়।
বাজারে ইতিমধ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের সঞ্চার দেখা যাচ্ছে। শিপিং লাইনগুলো সম্ভাব্য দেরি ও অতিরিক্ত চার্জের জন্য কন্টেইনার রেট বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে, রপ্তানি-আমদানি সংস্থাগুলো বিকল্প বন্দর ব্যবহার বা সাপ্লাই চেইন পুনর্গঠনের পরিকল্পনা শুরু করেছে।
বন্দরের প্রশাসন গুজব ও অশান্তি কমাতে তথ্যপ্রচারণা চালু করেছে, তবে শ্রমিকদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘটের সম্ভাবনা রয়ে গেছে। যদি লিজ চুক্তি চালু থাকে, তবে বন্দর কার্যক্রমের স্বাভাবিকতা পুনরুদ্ধার হতে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদী ধর্মঘট বন্দরকে আঞ্চলিক ট্রেড হাব হিসেবে তার অবস্থান ক্ষুন্ন করতে পারে। বিশেষ করে, চীন ও ভারতীয় বাজারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দরকে বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার করা কোম্পানিগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডিপ ওয়ার্ল্ডের NCT লিজ বাতিলের দাবি নিয়ে শ্রমিকদের ধর্মঘট বন্দর কার্যক্রমে ব্যাপক ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি শিপিং খরচ বাড়ানো, পণ্য সরবরাহে দেরি এবং বাণিজ্যিক ঝুঁকি বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে যদি সমঝোতা না হয়, তবে বন্দরকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।



