কয়েকটি বড় প্রযুক্তি সংস্থা সাম্প্রতিক ছাঁটাইকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) গ্রহণের ফলাফল বলে প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণাগুলো নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে প্রশ্নের মুখে পড়েছে যে, AI সত্যিই কর্মশক্তি পুনর্গঠনের প্রধান চালিকা কি না, নাকি এটি অন্য সমস্যার আড়ালে একটি অজুহাত।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোম্পানিগুলো AI‑কে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে ব্যবহার করে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও বাজারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে চায়। বিশেষ করে কোভিড‑১৯ মহামারির সময় অতিরিক্ত নিয়োগের ফলে সৃষ্ট অতিরিক্ত ব্যয়কে কমাতে এই ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হচ্ছে।
২০২৫ সালে AI‑কে ছাঁটাইয়ের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৫০,০০০ এর বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের মধ্যে। এই সংখ্যার মধ্যে আমাজন এবং পিন্টারেস্টের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও অন্তর্ভুক্ত, যারা তাদের সাম্প্রতিক কর্মী হ্রাসকে AI‑এর প্রয়োগের ফলাফল বলে ব্যাখ্যা করেছে।
ফরেস্টার ইনস্টিটিউটের জানুয়ারি মাসের একটি গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়, বেশিরভাগ সংস্থা AI‑সম্পর্কিত ছাঁটাই ঘোষণা করলেও তাদের কাছে পূর্ণাঙ্গ, যাচাইকৃত AI সমাধান এখনও প্রস্তুত নেই। রিপোর্টে এই প্রবণতাকে “AI‑ওয়াশিং” বলা হয়েছে, অর্থাৎ আর্থিক স্বার্থের জন্য AI‑কে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা।
“AI‑ওয়াশিং” শব্দটি মূলত সেই পরিস্থিতিকে নির্দেশ করে, যেখানে কোম্পানি ভবিষ্যতে AI‑এর সম্ভাব্য প্রয়োগের ভিত্তিতে বর্তমান ব্যয় হ্রাসকে যুক্তি দেয়, যদিও বাস্তবে তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এই পদ্ধতি বিনিয়োগকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের কাছে কোম্পানির আর্থিক স্বাস্থ্যের ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরতে সহায়তা করে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মলি কিন্ডার উল্লেখ করেছেন, AI‑কে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা একটি “বিনিয়োগকারী-বান্ধব” বার্তা, যা ব্যবসার প্রকৃত সমস্যাকে গোপন করে। তিনি বলেন, যদি সংস্থাগুলো সত্যিই ব্যবসায়িক সমস্যার স্বীকার করে, তবে তা শেয়ার মূল্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনিয়োগকারীরা AI‑কে কৌশলগত অগ্রগতির চিহ্ন হিসেবে দেখেন, তাই AI‑সংক্রান্ত ছাঁটাই ঘোষণার ফলে শেয়ার মূল্যে স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে যদি AI‑এর বাস্তবায়ন ধীরগতি বা ব্যর্থ হয়, তবে বাজারের আস্থা হ্রাস পেতে পারে।
এই ধরনের ঘোষণার ফলে কর্মী বাজারে অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। কোভিড‑১৯ সময়কালে দ্রুত নিয়োগের ফলে গৃহীত অতিরিক্ত কর্মশক্তি এখন সমন্বয় প্রয়োজন, এবং AI‑কে একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবিক সমস্যার সমাধান নয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, AI‑কে ছাঁটাইয়ের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করলে প্রকৃত AI‑প্রযুক্তির উন্নয়ন ও গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। যদি সংস্থাগুলো বাস্তবিক AI প্রকল্পে বিনিয়োগ না করে, তবে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হারানোর ঝুঁকি থাকে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে AI‑সম্পর্কিত কর্মী হ্রাসের প্রবণতা কমে যাবে বলে অনুমান করছেন, যদি না সংস্থাগুলো সত্যিকারের AI‑ভিত্তিক পণ্য ও সেবা চালু করে। সুতরাং, AI‑কে কেবল ব্যয় হ্রাসের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার না করে, বাস্তবিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় সংহত করা জরুরি।
বিনিয়োগকারী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল বার্তা হল, AI‑সংক্রান্ত ঘোষণার পেছনে প্রকৃত প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা আছে কিনা তা সতর্কভাবে মূল্যায়ন করা। স্বচ্ছতা ও বাস্তবিক ডেটা ছাড়া AI‑কে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, বর্তমান সময়ে AI‑কে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা কিছু সংস্থার জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধা এনে দিতে পারে, তবে এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল। বাজারের স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী বৃদ্ধির জন্য AI‑এর প্রকৃত প্রয়োগ ও কর্মশক্তি সমন্বয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য।



