ঢাকা, ৩১ ডিসেম্বর – দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তীব্র মন্তব্য শোনা গেল। তিনি একই দিনে বেগম খালেদা জিয়ার শেষ সমাহিতে উপস্থিত আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সার্কের চেতনা এখনও সক্রিয় রয়েছে বলে জোর দেন। ইউনূসের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য ছিল সার্ককে পুনরায় কার্যকর করা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন দিক উন্মোচন করা।
বেগম খালেদা জিয়ার সমাধি অনুষ্ঠানে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিয়নপো ডি. এন. ধুংগেল, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস. জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও পর্যটনমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ এবং মালদ্বীপের উচ্চশিক্ষা, শ্রম ও দক্ষতা উন্নয়নমন্ত্রী ড. আলী হায়দার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এই নেতারা সমাধি সমাবেশে একত্রিত হয়ে বেগম জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং আঞ্চলিক সংহতির প্রতীক হিসেবে সার্কের উপস্থিতি পুনর্ব্যক্ত করতে সমবেত হন।
সমাবেশের পর সরদার আয়াজ সাদিক এবং বালা নন্দ শর্মা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে স্বল্পকালীন সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। একই সময়ে বিকালের পর ড. আলী হায়দার আহমেদ এবং বিজিতা হেরাথও ইউনূসের সঙ্গে আলাপ করেন। এই সংক্ষিপ্ত মিটিংগুলোতে সার্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
ইউনূস উপস্থিত সকল আঞ্চলিক নেতাকে একই বার্তা পুনরায় জোর দেন – সার্ককে যেকোনো উপায়ে পুনরুজ্জীবিত করা অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, বেগম জিয়ার সমাধি সমাবেশে আঞ্চলিক নেতাদের একত্রিত হওয়া সার্কের চেতনার সক্রিয় উপস্থিতি প্রমাণ করে। এই সমাবেশকে তিনি সার্কের ঐতিহাসিক ঐক্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, সার্কের চেতনা আজও জাগ্রত ও বজায় রয়েছে এবং তা সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব। তিনি উল্লেখ করেন, “আমি সার্কের নেতাদের মধ্যে একটি মিলনমেলা আয়োজন করতে চাই, এমনকি তা পাঁচ মিনিটের জন্য হলেও।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি আঞ্চলিক শীর্ষ নেতাদের স্বল্পমেয়াদী সংলাপের মাধ্যমে সংহতি গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন।
ইউনূসের মতে, প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষের জন্য সার্ক একটি অর্থবহ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে, যদি তা কার্যকরভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়। তিনি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। এ ধরনের সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সমাবেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। ইউনূস উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত নির্বাচনের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সক্ষম। তিনি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নির্বাচনের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
ইউনূসের এই মন্তব্যগুলো আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। যদি সার্কের পুনরুজ্জীবন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তবে তা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন দিক দিতে পারে। একই সঙ্গে, বাংলাদেশ তার নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে ইতিবাচক ছাপ ফেলতে পারে।
সার্কের পুনরুজ্জীবনের জন্য প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত বৈঠক, যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত। ইউনূসের আহ্বান এই ধরণের কাঠামোগত পদক্ষেপের সূচনা হতে পারে। তবে বাস্তবায়নের জন্য সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও সম্পদ সমন্বয় প্রয়োজন হবে।
বেগম জিয়ার সমাধি সমাবেশে উপস্থিত আঞ্চলিক নেতাদের এই সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ এবং ইউনূসের তীব্র আহ্বান দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইঙ্গিত দেয়। সার্কের পুনরুজ্জীবন যদি সফল হয়, তবে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক সংহতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।
অবশেষে, ইউনূসের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে সার্কের চেতনা এখনও জাগ্রত, এবং তা সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক নেতাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে আঞ্চলিক সংহতির পুনর্নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের সূচনা হতে পারে এই সমাবেশ।



