বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১ এপ্রিল ১৯৮৪ সালে দলীয় শীর্ষে অধিষ্ঠিত হন। তার জন্মস্থান উত্তরবঙ্গের দিনাজপুর, যেখানে ১৯৪০‑এর দশকে তার পরিবার বসবাস করত। পারিবারিক ডাক্তার শিশুর নাম ‘শান্তি’ রাখার পরামর্শ দেন, তবে সামাজিক ও ধর্মীয় উত্তেজনার কারণে শেষমেশ তাকে ‘পুতুল’ নামে ডাকতে শুরু করা হয়।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪২ সালের ১ জুলাই, দিনাজপুরের এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে। তার পিতার নাম এস্কান্দার মজুমদার, মা ছিলেন ফাতিমা বেগম। পিতার কাজ ছিল স্থানীয় জমিদার ও ব্যবসায়ী, আর মা গৃহিণী। শিশুর নামকরণে পারিবারিক ডাক্তার অবনী গোস্বামীর প্রস্তাব ছিল ‘শান্তি’, যা শান্তি ও সমঝোতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশে ধর্মীয় সংঘাতের ঝুঁকি থাকায় পরিবার নামের পরিবর্তে একটি স্নেহপূর্ণ ডাকনাম বেছে নেয়। বড় বোন সেলিমা ইসলাম শিশুটিকে ‘পুতুল’ বলে ডেকেছিলেন, কারণ তার চেহারা ও স্বভাবকে তিনি পুতুলের মতো কোমল ও স্নেহপূর্ণ বলে মনে করেন। এই ডাকনাম দ্রুত পরিবারের সকলের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বড় বোন খুরশিদ জাহান, যাকে ‘টিপসি’ নামে ডাকা হতো, যদিও পরে এই নাম আর ব্যবহার না করা হয়, তবু পরিবারের মধ্যে নামের পরিবর্তন নিয়ে কোনো বিরোধ দেখা দেয়নি। সরকারী নথিতে শিশুর নাম ‘খালেদা খানম’ হিসেবে রেজিস্টার করা হয়, যা পরে রাজনৈতিক জীবনে ‘খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিতি পায়।
বছরের পর বছর, খালেদা জিয়া রাজনৈতিক মঞ্চে উত্থান লাভ করে। ১৯৮৪ সালের ১ এপ্রিল তিনি বিএনপির চেয়ারম্যানের পদ গ্রহণ করেন, যা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে নতুন দিক উন্মোচন করে। তার নেতৃত্বে দলটি বহু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং দেশের শাসন কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একই বছর, মাসিক ‘নিপুণ’ পত্রিকায় তার বাবা এস্কান্দার মজুমদার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন যে, পরিবারের হাউস ফিজিশিয়ান অবনী গোস্বামীর পরামর্শে শিশুর নাম ‘শান্তি’ রাখা হয়েছিল, তবে ধর্মীয় উত্তেজনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। ফলে তারা ‘পুতুল’ নামে ডাকনাম গ্রহণ করে, যা পরিবারের সবার কাছেই প্রিয় হয়ে ওঠে।
কথা অনুযায়ী, খালেদা জিয়া শৈশবকাল থেকেই সবার আদরের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। তার চেহারা ও আচরণকে পরিবারে ‘পুতুল’ বলে প্রশংসা করা হতো, যা তার আত্মবিশ্বাস গঠনে সহায়তা করে। এই স্নেহপূর্ণ পরিবেশ তার পরবর্তী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে দৃঢ়তা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে ভূমিকা রাখে।
খালেদা জিয়ার পারিবারিক পটভূমি ও নামকরণের গল্প বিভিন্ন লেখকের বইতে উল্লেখিত হয়েছে। মহফুজ উল্লাহের ‘বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম’ এবং মহিউদ্দিন আহমদের ‘খালেদা’ সহ অন্যান্য রচনায় এই বিষয়টি বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সূত্রগুলো একই তথ্য পুনরায় নিশ্চিত করে, যা তার জন্ম ও নামের ইতিহাসকে স্পষ্ট করে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসেবে তার রাজনৈতিক যাত্রা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়। জিয়াউর রহমান, যিনি পরবর্তীতে দেশের প্রেসিডেন্ট হন, তার সঙ্গে খালেদা জিয়ার বিবাহ দেশের রাজনৈতিক জগতে নতুন সংযোগ স্থাপন করে। এই বিবাহের ফলে তিনি রাজনৈতিক শক্তি ও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
খালেদা জিয়ার পিতার জন্মস্থান নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার শ্রীপুর গ্রাম, যা আজকের ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত। এস্কান্দার মজুমদার অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯১৯ সালে তার বোন ও ভগ্নিপতির সঙ্গে ভারতের জলপাইগুড়িতে বসবাস করেন, যা তার শৈশবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে সমৃদ্ধ করে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রভাবের পরিধি বিস্তৃত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পারস্পরিক বিরোধের পরেও তিনি দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তার নেতৃত্বে বিএনপি বহু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে এবং দেশের শাসন কাঠামোতে সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি করে।
ভবিষ্যতে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবস্থান ও তার পারিবারিক ঐতিহ্য দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনও পর্যবেক্ষণযোগ্য। তার জন্ম ও নামকরণের গল্প তার ব্যক্তিগত পরিচয়কে গঠন করেছে, যা রাজনৈতিক জীবনে তার দৃঢ়তা ও জনমত গঠনে সহায়তা করেছে। এই ঐতিহাসিক তথ্যগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে রয়ে যাবে।



