বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালে, সামাজিক মিডিয়ায় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন দ্রুত বাড়ছে। এই বিজ্ঞাপনগুলো আইনগতভাবে অনুমোদিত হলেও, মেটা প্ল্যাটফর্মের নীতি অনুযায়ী প্রতিটি বিজ্ঞাপনে স্পনসরের নাম উল্লেখ থাকতে হবে। স্পনসর তথ্য না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সনাক্ত করে সরিয়ে ফেলা উচিত। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মেটার স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ ব্যবস্থা এই নিয়মগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগে ব্যর্থ।
ডিসমিসল্যাব দল ডিসেম্বর ৭ থেকে ১২, ২০২৫ পর্যন্ত মেটার বিজ্ঞাপন লাইব্রেরি বিশ্লেষণ করে এই ত্রুটিগুলো উন্মোচন করেছে। বিশ্লেষণে মোট ৫০২টি প্রচারমূলক সামগ্রী পাওয়া গেছে, যেগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা নেতার নাম উল্লেখ রয়েছে। এসব বিজ্ঞাপনের বেশিরভাগই নির্বাচনী প্রচার হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
তবে মেটা এই ৫০২টি বিজ্ঞাপরের মধ্যে কমপক্ষে ৪১টি সঠিকভাবে “রাজনৈতিক, নির্বাচনী বা সামাজিক বিষয়” হিসেবে চিহ্নিত করেনি। এর মধ্যে ৩২টি সরাসরি কোনো দল বা নেতার এজেন্ডা প্রচার করলেও স্পনসর ডিসক্লেইমার যুক্ত করা হয়নি। ফলে এই বিজ্ঞাপনগুলো ব্যবহারকারীর ফিডে স্বাভাবিকভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে।
অতিরিক্তভাবে বিশ্লেষণে ৪২টি পণ্য বিজ্ঞাপন চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোতে দলীয় লোগোসহ টি-শার্ট, ক্যাপ এবং হুডি বিক্রি করা হচ্ছে। মেটার নীতি অনুযায়ী এমন পণ্য বিজ্ঞাপনকে “বিশেষ ক্যাটেগরি” হিসেবে চিহ্নিত করতে হয়, যাতে রাজনৈতিক সংযোগ স্পষ্ট থাকে। তবে কোনো বিজ্ঞাপনই এই ক্যাটেগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, ফলে সেগুলো সাধারণ ই-কমার্স বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছেছে।
এই ধরনের ত্রুটি শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনদাতার স্বার্থ রক্ষা করে না, বরং ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে। যখন রাজনৈতিক বার্তা পণ্য বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিশে যায়, তখন ভোটারদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে এই ধরনের অস্বচ্ছতা জনমত গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
মেটার স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণে এই দুর্বলতা নতুন নয়। সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়ন (ডিইউসিএসইউ) নির্বাচনের আগে একই ধরনের সমস্যার রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল। সেই সময়েও কিছু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়নি, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার এবং মনাশ ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ার পিএইচডি গবেষক মোঃ পিজুয়ার হোসেন পূর্বে উল্লেখ করেন, যদি এই ধরনের অনিয়ম জাতীয় নির্বাচনে পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তা নির্বাচনী প্রক্রিয়া ও জনসাধারণের বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তার সতর্কতা এখন বাস্তব রূপ নিচ্ছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো মেটাকে অনুরোধ করেছে, স্বয়ংক্রিয় সনাক্তকরণ অ্যালগরিদমে উন্নতি এনে স্পনসর ডিসক্লেইমার বাধ্যতামূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে। তারা দাবি করে, মেটার বিজ্ঞাপন লাইব্রেরি ও রিভিউ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে তৃতীয় পক্ষের অডিট করা উচিত।
নির্বাচনের আগে মেটা যদি এই ত্রুটিগুলো দ্রুত সংশোধন না করে, তবে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন ও পণ্য বিজ্ঞাপনের মিশ্রণ ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে এবং নির্বাচনী ফলাফলে অনিচ্ছাকৃত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মের কঠোর প্রয়োগ এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ মেটার স্বয়ংক্রিয় বিজ্ঞাপন সনাক্তকরণে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি প্রকাশ করেছে, যা দেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।



