ইরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় লোরেস্তান প্রদেশে ১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভের মাঝখানে প্রথম প্রাণহানি ঘটেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ ফলে আধা‑সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নিহত হন, আর বিক্ষোভকারীরা সরকারের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশে রাস্তায় নেমে এসেছে।
লোরেস্তানের একটি শহরে নিরাপত্তা গার্ডরা যখন প্রতিবাদকারীদের একটি সরকারি ভবনের প্রবেশদ্বার ভেঙে ঢোকার চেষ্টা থামাতে গুলি চালায়, তখন গুলিবর্ষণের ফলে এক কর্মকর্তা মারা যান। ঘটনাস্থলে উপস্থিতদের মতে গুলির সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি, তবে গুলিবর্ষণই মৃত্যুর মূল কারণ বলে অনুমান করা হচ্ছে।
একই দিন, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে বিক্ষোভকারীরা একটি সরকারি অফিসে প্রবেশের চেষ্টা করে, ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণ আবারও ঘটেছে। নিরাপত্তা কর্মীরা গুলিবর্ষণকে ‘অবৈধ প্রবেশ রোধের জন্য’ দাবি করে, তবে প্রতিবাদকারীরা উচ্চ দামের ও মুদ্রাস্ফীতি‑জনিত অসন্তোষের মুখে আছেন।
মুদ্রা বাজারে রিয়ালের মান ডলারের তুলনায় রেকর্ড নিম্ন স্তরে পৌঁছানোর পর, রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতার হ্রাসের প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু করে। এই ধর্মঘট দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বুধবারও অব্যাহত রয়েছে।
তেহরানের একটি ব্যবসায়িক ফোরামে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বিক্ষোভের তীব্রতা নিয়ে ‘বিদেশি হস্তক্ষেপ’কে দায়ী করে এবং জাতির ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে দেশের শত্রুরা বাহ্যিকভাবে চাপ প্রয়োগ করছে এবং অভ্যন্তরেও অবৈধ শক্তি কাজ করছে।
প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরান ‘পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধে’ জড়িয়ে আছে এবং শত্রুরা বোমা, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দেশকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তিনি যুক্তি দেন, দৃঢ় সংকল্প ও ঐক্য থাকলে এই শত্রুদের কোনো সাফল্য হবে না।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইরানের ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করে, যা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। একই সময়ে ইরান ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইউরোপীয় শক্তিগুলোও সংযুক্ত জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপ করে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বোমাবর্ষণের পর এই পদক্ষেপগুলো গৃহীত হয়।
২০২৫ সালে রিয়ালের মান ডলারের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে যায়, ফলে বছরের শেষের দিকে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। এই তীব্র মূল্যস্ফীতি গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষের জন্ম দেয় এবং ধর্মঘটের তীব্রতা বাড়ায়।
বিক্ষোভের পরিধি লোরেস্তান ও ফার্সের সীমা অতিক্রম করে তেহরান, শীরাজ এবং অন্যান্য প্রধান শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবাদকারীরা মূলত মুদ্রা অবমূল্যায়ন, বেকারত্ব এবং মৌলিক পণ্যের দামের দ্রুত বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সাড়া দিচ্ছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সহিংসতা দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এই ধরণের ব্যাপক অস্থিরতা সরকারকে আর্থিক নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন রূপ নিতে পারে। প্রেসিডেন্টের ঐক্যবদ্ধতার আহ্বান যদিও তাত্ক্ষণিক শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সংস্কার ও বৈদেশিক নীতি সমন্বয় না হলে অশান্তি অব্যাহত থাকতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির ফলে দেশব্যাপী বিক্ষোভের শৃঙ্খল গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে প্রথম প্রাণহানি লোরেস্তানে ঘটেছে। সরকার ঐক্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখার দাবি জানিয়ে, শত্রুদের দোষারোপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, তবে ভবিষ্যতে নীতি পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন না হলে অস্থিরতা বাড়তে পারে।



