সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন প্রায় এক দশক আগে “সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর” প্রতিষ্ঠা করে। এই জাদুঘরটি প্রায় ১৫০ বছর পুরনো, ঐতিহ্যবাহী আসমি শৈলীর টিনশেড ভবনে অবস্থিত, যার কাঠের পাটাতনের মেঝে এবং সামনে খোলা প্রান্তর রয়েছে। মূলত জেলা কালেক্টরেটের অফিস হিসেবে ব্যবহৃত এই ভবনটি, জেলা প্রশাসকের অফিস অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পর কিছু সময়ের জন্য পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল, তবে পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনিক কাজের জন্য ব্যবহার করা হয় এবং অবশেষে জাদুঘর হিসেবে পুনরায় গড়ে তোলা হয়।
গত বছর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জাদুঘরে আক্রমণ ঘটে, ফলে বহু মূল্যবান সামগ্রী নষ্ট ও হারিয়ে যায়। এই ক্ষতির পর জেলা প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে জাদুঘরের পুনর্নির্মাণ ও সংগ্রহের পুনরুদ্ধার কাজ শুরু করে। পুনর্গঠনের সময় মূল কাঠামো সংরক্ষণ করে আধুনিক প্রদর্শনী ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যাতে দর্শকরা ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে নতুনভাবে উপভোগ করতে পারেন।
জাদুঘরের প্রবেশদ্বার পার হয়ে প্রথমে দর্শকরা একটি বইয়ের তাকের পাশে বসে থাকা প্রদর্শনী দেখতে পান, যেখানে জেলার প্রথম মহকুমা প্রশাসকের ব্যবহার করা চেয়ার ও টেবিল, শতবর্ষ পুরনো রাজকীয় টাইপ রাইটার মেশিনসহ বিভিন্ন বিরল সামগ্রী রাখা আছে। এরপর কক্ষগুলোতে জেলা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্থানীয় সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত উপকরণগুলো ধারাবাহিকভাবে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি বিভাগে ঐতিহাসিক নথি, ফটোগ্রাফ, ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্ম এবং স্থানীয় শিল্পীদের সৃষ্টিগুলি অন্তর্ভুক্ত, যা দর্শকদেরকে সুনামগঞ্জের সমৃদ্ধ অতীতের একটি সমন্বিত চিত্র প্রদান করে।
ভূগোলিকভাবে জাদুঘরটি সুনামগঞ্জ পৌর শহরের আলফাত স্কোয়ারের পূর্ব দিকে, ডি.এস. রোড ধরে পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে অবস্থিত। বাম পাশে শহরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয় ও শাপলা চত্বর, দক্ষিণে জেলা স্টেডিয়াম এবং পূর্বে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ছিল। এই অবস্থানটি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য করে তুলেছে, ফলে জাদুঘরটি স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রমে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
জাদুঘরের পুনর্গঠনকালে জেলা প্রশাসন স্থানীয় শিল্পী ও সংস্কৃতি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাউল গানের থিমে একটি সঙ্গীতময় পরিবেশ তৈরি করেছে। মরমি সাধক হাসন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মৃতি ও সৃষ্টিকর্মকে আলোকিত করা হয়েছে। এই প্রচেষ্টা জাদুঘরের শিক্ষামূলক দিককে সমৃদ্ধ করে, যাতে দর্শকরা শুধু বস্তুগত ঐতিহ্যই নয়, সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও অনুভব করতে পারেন।
প্রদর্শনীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল হাওড়-বাঁড় পাহাড়-নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্যকে চিত্রিত করা শিল্পকর্ম, মরমিয়া গানের লিরিক্সের নথি এবং স্থানীয় কৃষি ও মাছ ধরা জীবনের সরঞ্জাম। এসব উপাদান একত্রে জাদুঘরের শিক্ষামূলক মূল্যকে বাড়িয়ে দেয়, কারণ শিক্ষার্থীরা সরাসরি ঐতিহ্যবাহী জীবনের বাস্তব দিকগুলি পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এছাড়া, জাদুঘরে সংরক্ষিত রাজকীয় টাইপ রাইটার মেশিনটি প্রযুক্তিগত ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যা আধুনিক শিক্ষার্থীদেরকে প্রাচীন লেখন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
জাদুঘরের পুনরায় উন্মোচন স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নতুন শিক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। শিক্ষকরা এখন পাঠে ঐতিহাসিক নথি ও শিল্পকর্ম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদেরকে স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারেন। এছাড়া, জাদুঘরের পরিচালনা পরিষদ নিয়মিত কর্মশালা ও গাইডেড ট্যুরের আয়োজন করে, যাতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি জাদুঘরের সংগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিখতে পারে।
যারা সুনামগঞ্জের ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও জানার ইচ্ছা রাখেন, তাদের জন্য জাদুঘরের কাজের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। প্রবেশের জন্য কোনো টিকিটের প্রয়োজন নেই, তবে গাইডেড ট্যুরের জন্য পূর্বে সংরক্ষণ করা সুবিধাজনক। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো শিক্ষামূলক প্যাকেজে প্রশ্নোত্তর সেশন এবং ছোট গ্রুপে আলোচনা অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা পাঠের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতা যুক্ত করে।
সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরের পুনর্গঠন শুধু হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারই নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শিক্ষামূলক সম্পদ হিসেবে কাজ করছে। আপনি যদি স্থানীয় ইতিহাসে আগ্রহী হন, তবে এই জাদুঘরটি পরিদর্শন করে সুনামগঞ্জের সমৃদ্ধ অতীতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।
**ব্যবহারিক টিপ:** জাদুঘরে যাওয়ার আগে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ট্যুরের সময়সূচি চেক করুন এবং গাইডেড ট্যুরের জন্য অগ্রিম রেজিস্ট্রেশন করুন; এভাবে আপনি সীমিত সিটের সুবিধা পেয়ে শিক্ষামূলক সেশনগুলোতে অংশ নিতে পারবেন।



