জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান সোমবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানালেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিনগুলোতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো কেবল চলমান প্রক্রিয়ার অংশ। তিনি এই মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে বৈঠক শেষ করে মন্ত্রণালয় থেকে বের হওয়ার সময়। প্রশ্নের মূল বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি, যার উত্তর তিনি সংক্ষেপে “এটা চলমান প্রক্রিয়া” দিয়ে দিলেন।
বৈঠকের পরে, সাংবাদিকরা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, যদি পরবর্তী সরকার এই চুক্তিগুলো এগিয়ে না নেয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিশ্রুতি কী হবে। খলিলুর রহমান উত্তর দিলেন, এধরনের প্রশ্ন অনুমানভিত্তিক এবং ভবিষ্যৎ সরকারের নীতি নির্ধারণের উপর নির্ভরশীল। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হয় দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা।
সম্প্রতি খলিলুর রহমানকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত করা হয়েছে। এই পদে নিয়োগের পর সমালোচনা উঠে আসে যে কোনো দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিমান সংস্থার বোর্ডে বসে না। খলিলুর রহমান ব্যাখ্যা করেন, বিশ্বজুড়ে সব দেশে বিমান সংস্থা নেই, তাই এই নিয়োগ দেশের স্বার্থে করা হয়েছে এবং তা কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের লঙ্ঘন নয়।
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই ২০২৪-এ গণ-অভ্যুত্থানের পর ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের কাঠামো সংস্কার, জুলাই হত্যার বিচার এবং শীঘ্রই অনুষ্ঠিত হওয়া জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য সরকার বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি অংশীদারিত্ব অন্তর্ভুক্ত।
চীনের সঙ্গে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের চুক্তি, পাকিস্তান থেকে JF‑17 থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়, চীন থেকে J‑10C যুদ্ধবিমান সংগ্রহ, ইউরোপীয় কনসোর্টিয়াম থেকে ইউরো ফাইটার টাইফুন ক্রয়, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সাবমেরিন, তুরস্ক থেকে T‑129 আক্রমণ হেলিকপ্টার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্ল্যাক হক মাল্টি‑রোল হেলিকপ্টার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, ৬৫০ কোটি টাকায় যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের জন্য খালিদ বিন ওয়ালিদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব চুক্তি অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সরকারী সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইসব চুক্তি শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত হওয়ায়, কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, এগুলো কি পরবর্তী সরকার গ্রহণ করবে নাকি পুনর্বিবেচনা করবে। খলিলুর রহমানের মতে, প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয়েছে, তাই নতুন সরকারকে এগুলো পুনরায় মূল্যায়ন করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে তিনি স্বীকার করেন, নতুন সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার অনুসারে কিছু চুক্তি সংশোধন বা বাতিল হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ পর্যায়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই চুক্তি দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে, এবং এটি নির্বাচনের আগে শেষ করা হবে বলে সরকারী পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মন্তব্য এবং সরকারী পদক্ষেপগুলো নির্দেশ করে যে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে ত্বরান্বিত কাজ করছে। তবে পরবর্তী সরকার কীভাবে এই চুক্তিগুলোকে পরিচালনা করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। এই মুহূর্তে, দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য চলমান প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন।



