সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের যুগে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল হক, প্রাক্তন সাংবাদিক শাহেদ আলম এবং অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল তথ্যের অতিপ্রাচুর্য্যের সময় সত্যের অভাব কীভাবে মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং তা রোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা একমত যে আজকের তথ্যপ্রবাহে সত্যের চেয়ে মিথ্যা বেশি ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে মিডিয়ার ওপর জনগণের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে। তারা জোর দিয়ে বলছেন যে তথ্যের সঠিকতা নিশ্চিত করতে মিডিয়া লিটারেসি—অর্থাৎ তথ্যের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করার ক্ষমতা—অত্যন্ত জরুরি।
উপাচার্য ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী উল্লেখ করেন, সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে তথ্য প্রচার সমাজের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি বলেন, এই ধরনের সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
বিশেষ করে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তথ্য বিশ্লেষণ, ডেটা যাচাই এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। এ ধরনের প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে মিডিয়া শিল্পে কাজ করার সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল হক ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এমন ল্যাবের মাধ্যমে ভুল তথ্যের উৎস সনাক্ত করা, ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ করা এবং মিথ্যা কন্টেন্টের প্রচার রোধে প্রযুক্তিগত সমাধান তৈরি করা সম্ভব হবে।
প্রাক্তন সাংবাদিক শাহেদ আলম তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব এবং সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন। তিনি মিডিয়া কর্মীদেরকে সক্রিয়ভাবে তথ্যের প্রামাণিকতা পরীক্ষা করতে এবং সমাজে সঠিক বার্তা পৌঁছাতে আহ্বান জানান।
অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন কীভাবে সামাজিক আস্থাকে ক্ষয় করে এবং বিভাজনের ঝুঁকি বাড়ায়, তা উল্লেখ করেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ভুয়া খবর দ্রুত শেয়ার হয়ে জনমতকে প্রভাবিত করে এবং সামাজিক সমন্বয়কে ব্যাহত করে।
এই আলোচনায় উল্লেখ করা হয় যে, সামাজিক মিডিয়ার অ্যালগরিদম প্রায়শই এমন কন্টেন্টকে অগ্রাধিকার দেয় যা বেশি ক্লিক ও শেয়ার পায়, যদিও তা সত্য নাও হতে পারে। ফলে, ব্যবহারকারীরা অজান্তেই ভুল তথ্যের শিকার হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা শিক্ষার্থীদের মিডিয়া লিটারেসি প্রশিক্ষণকে পাঠ্যক্রমের অংশ বানাতে পরামর্শ দেন। এতে তথ্যের উৎস যাচাই, কপিরাইটের মৌলিক নীতি এবং অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিক্ষার্থীরা এই দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কর্মশালা, সেমিনার এবং হ্যাকাথন আয়োজনের মাধ্যমে বাস্তবিক অভিজ্ঞতা প্রদান করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করে কীভাবে ভুয়া খবর তৈরি ও ছড়িয়ে পড়ে তা শিখতে পারবে এবং তা মোকাবিলার কৌশল তৈরি করতে পারবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, তথ্য যাচাইয়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় টুল এবং ফ্যাক্ট-চেকিং সফটওয়্যার ব্যবহারকে উৎসাহিত করা উচিত। এসব টুলের সাহায্যে দ্রুত কোনো খবরের সত্যতা নির্ণয় করা যায় এবং ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা সম্ভব।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করুন, একাধিক স্বতন্ত্র সূত্র থেকে তথ্য তুলনা করুন এবং সন্দেহজনক কন্টেন্টের ক্ষেত্রে ফ্যাক্ট-চেকিং সাইটে অনুসন্ধান করুন। এছাড়া, সামাজিক মিডিয়ায় অজানা লিঙ্কে ক্লিক করা বা অপ্রমাণিত ভিডিও শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন। এই সহজ পদক্ষেপগুলো মিসইনফরমেশনকে কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।



