ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ১ ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালীর ওপর দুই দিনের সরাসরি গোলাবর্ষণসহ নৌ মহড়া চালাবে বলে জানিয়েছে। এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে, যেখানে ইরান ও United States এর সম্পর্ক ইতিমধ্যে টানাপোড়েনের শীর্ষে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের পথ, যা আজকের ঘোষণার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মধ্যে অবস্থিত এবং আরব উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। প্রণালীর সংকীর্ণতম অংশ প্রায় ৩৩ কিলোমিটার চওড়া, তবে গভীরতা এতই বেশি যে বিশ্বের বৃহত্তম তেলবাহী জাহাজও এখানে চলাচল করতে পারে। দৈনিক প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবহন হয়, যা গ্লোবাল তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে।
আইআরজিসি কর্তৃক ঘোষিত নৌ মহড়া সরাসরি গোলাবর্ষণসহ দুই দিনের সময়সীমা নিয়ে হবে, যা আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর নজরে এসেছে। মহড়ার সময় নিরাপত্তা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানকে সতর্ক করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে কোনো অবহেলা না করে বাণিজ্যিক জাহাজ বা মার্কিন ও মিত্র দেশের নৌবাহিনীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে না পড়ে।
হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব তেল ছাড়াও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এই রুটের মাধ্যমে তাদের গ্যাস রপ্তানি করে, যা বৈশ্বিক শক্তি বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রুটের শিপিং লেনগুলো প্রতিটি দিকেই মাত্র কয়েক কিলোমিটার চওড়া, ফলে কোনো সামান্য বিঘ্নই তেলের দাম ও গ্যাসের মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর বেশিরভাগের তেল রপ্তানির বিকল্প কোনো পথ নেই, তাই হরমুজে কোনো বাধা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়াতে পারে। যদিও প্রণালী আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে স্বীকৃত, তবু এটি কয়েকটি দেশের আঞ্চলিক জলসীমার সীমানা অতিক্রম করে, যা আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতা বাড়িয়ে দেয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, হরমুজে সম্ভাব্য কোনো ব্যাঘাত গ্লোবাল তেল মূল্যের দ্রুত উত্থান ঘটাতে পারে, বিশেষ করে যখন ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেল-সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও প্রতিক্রিয়া চলমান। তেল বাজারে অস্থিরতা শিপিং কোম্পানিগুলোর রুট পরিবর্তন, বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক খরচে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সতর্কতা এই মহড়ার সময় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর চলাচলকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। সেন্টকমের বিবৃতি অনুযায়ী, নৌ মহড়া আন্তর্জাতিক নৌচালনা নিয়ম মেনে পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এই সতর্কতা ইরানের সামরিক পরিকল্পনার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের পটভূমিতে এই নৌ মহড়া দেখা যায়। দুই দেশের পারস্পরিক সন্দেহ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেল ও নিরাপত্তা নীতি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হরমুজে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি আন্তর্জাতিক শক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অস্থিরতা যোগ করতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, হরমুজে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো বিকল্প রুট অনুসন্ধান করতে বাধ্য হতে পারে, যা অতিরিক্ত সময় ও খরচের সঙ্গে যুক্ত।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো হরমুজের পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। সম্ভাব্য বাণিজ্যিক জাহাজের রুট পরিবর্তন, বীমা শর্তের পুনর্বিবেচনা এবং তেল মূল্যের ওঠানামা এই রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিকভাবে ঘটবে। হরমুজের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গ্লোবাল জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।



