ফরাসি প্রযুক্তি সংস্থা ক্যাপজেমিনি তার যুক্তরাষ্ট্রের সাবসিডিয়ারি বিক্রির সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। সাবসিডিয়ারিটি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন প্রয়োগ সংস্থা ICE-কে লোক অনুসন্ধান সেবা প্রদান করছিল, যা জনমতকে উস্কে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের প্রভাব স্পষ্ট।
ক্যাপজেমিনির সরকারী সমাধান বিভাগ, Capgemini Government Solutions, ICE-কে “skip tracing” সেবা সরবরাহ করছিল। এই সেবা অনুপস্থিত ব্যক্তিদের অবস্থান নির্ণয় করে, যা অভিবাসন প্রয়োগ ও অপসারণ কার্যক্রমে ব্যবহার হয়। চুক্তি ১৮ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং ১৫ মার্চ পর্যন্ত চলার কথা।
সাবসিডিয়ারিটি ICE-কে মোট $৪.৮ মিলিয়ন (প্রায় £৩.৫ মিলিয়ন) পেমেন্ট পাবে বলে সরকারি রেকর্ডে উল্লেখ আছে। একই সময়ে এই ইউনিট ICE-কে মোট ১৩টি চুক্তি সরবরাহ করছিল। এই আর্থিক ও চুক্তিগত তথ্যগুলো প্রকাশের পর সংস্থার উপর তীব্র সমালোচনা বাড়ে।
ফরাসি সংসদ সদস্যরা ক্যাপজেমিনির এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা দাবি করেন যে সংস্থা তার গ্লোবাল নীতি ও নৈতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে, মিন্নেসোটা রাজ্যে ICE-এ ঘটিত গুলিবর্ষণ ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক নজর কেড়েছে।
মিন্নেসোটা শহরে ICE এজেন্টদের দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক রেনি নিকোল গুড ও অ্যালেক্স প্রেট্টি গুলি করে নিহত হওয়া ঘটনা ব্যাপক প্রতিবাদে রূপ নেয়। গুড এবং প্রেট্টি উভয়ই মিনিয়াপলিসে গুলিবর্ষণের শিকার হয়, যা ICE-র কঠোর নীতি ও প্রয়োগ পদ্ধতির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
শুটিংয়ের পর দেশব্যাপী প্রতিবাদে ICE-র কার্যক্রমের ন্যায়সঙ্গতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে অভিবাসন নীতি কঠোর করার পর থেকে ICE-র কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনসাধারণের উদ্বেগও বাড়ছে।
ক্যাপজেমিনির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংস্থা সাবসিডিয়ারির কিছু কার্যক্রমে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে গ্রুপের লক্ষ্য ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা কাজগুলো থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
বিবৃতি অনুসারে, ক্যাপজেমিনি তৎক্ষণাৎ এই ব্যবসা থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করবে। বিক্রয়ের মাধ্যমে সংস্থা তার মূল ব্যবসা ও গ্লোবাল সুনাম রক্ষা করতে চায়।
ICE, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে পুনরায় সক্রিয় হয়। শ্বেত বাড়িতে ফিরে আসার পর তিনি অভিবাসন দমন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার ফলে ICE-র গ্রেপ্তার ও ডিপোর্ট সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
সেই সময় থেকে ICE জনসাধারণের স্থানেও অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছে, যা নাগরিকদের মধ্যে নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। এই ধরনের কার্যক্রমের ফলে সংস্থার ওপর মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সমালোচনা তীব্র হয়েছে।
মিন্নেসোটা রাজ্যে ICE-র গুলিবর্ষণ ও অন্যান্য কড়া পদক্ষেপের পর, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ICE-র পদ্ধতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। বিশেষ করে, বর্ডার প্যাট্রোলের সঙ্গে সমন্বয়ে কাজ করা ICE-র কার্যক্রমকে নিন্দা করা হয়।
ক্যাপজেমিনির এই সাবসিডিয়ারি বিক্রির সিদ্ধান্ত শেয়ারহোল্ডার ও বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কিছু বিশ্লেষক সংস্থার আর্থিক ক্ষতি নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেন, অন্যদিকে কিছু বিনিয়োগকারী নৈতিক দায়িত্বের দিক থেকে এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।
ফ্রান্সের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিও ক্যাপজেমিনির এই চুক্তি ও বিক্রয় প্রক্রিয়ার উপর নজর রাখছে। তারা সংস্থার আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা জোর দিয়ে বলছে।
বাজারে ক্যাপজেমিনির শেয়ার মূল্য সাময়িকভাবে নেমে যাওয়া সত্ত্বেও, দীর্ঘমেয়াদে সংস্থার সুনাম পুনরুদ্ধার ও ব্যবসায়িক কৌশল পুনর্গঠন করা সম্ভব হতে পারে। তবে, ভবিষ্যতে অনুরূপ চুক্তি থেকে দূরে থাকার জন্য কঠোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেবে।
এই বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ক্যাপজেমিনির গ্লোবাল পোর্টফোলিওতে ICE-সংশ্লিষ্ট সেবা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত হবে। ফলে সংস্থা তার মূল আইটি পরামর্শ ও ডিজিটাল রূপান্তর সেবার ওপর মনোযোগ বাড়াতে পারবে।
অভিবাসন নীতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রেক্ষাপটে, বড় বহুজাতিক সংস্থাগুলোর জন্য সামাজিক দায়িত্ব ও নৈতিক ব্যবসা মডেল বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্যাপজেমিনির এই পদক্ষেপকে এই প্রবণতার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ক্যাপজেমিনি তার ICE-কে সেবা প্রদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের সাবসিডিয়ারি বিক্রি করবে, যা রাজনৈতিক চাপ, মানবাধিকার উদ্বেগ ও ব্যবসায়িক ঝুঁকির সমন্বয়ে গৃহীত হয়েছে। সংস্থার ভবিষ্যৎ কৌশল এখন নৈতিক মানদণ্ড ও বাজারের স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে।



