বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম আজ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নতুন মোরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) চুক্তি সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতে নতুন পিটিশন দাখিল করেছে। পিটিশনটি সরকারকে ইউএই‑ভিত্তিক ডি.পি. ওয়ার্ল্ডকে চুক্তি প্রদান প্রক্রিয়া স্থগিত করতে এবং উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি চাওয়ার আগে স্থিতি বজায় রাখতে অনুরোধ করে। পিটিশন দাখিলের সময়, দেশের পার্লামেন্টারি নির্বাচনের নিকটবর্তী সময়কে বিবেচনা করে, চুক্তি সম্পাদনকে নির্বাহী অতিরিক্ত ক্ষমতা ব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পিটিশনটি সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগে চেম্বার জাস্টিস ফারাহ মাহবুবের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। পিটিশনের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. আনোয়ার হোসেনের মতে, আদালতকে দ্রুত শুনানি নির্ধারণ করা উচিত, যাতে সরকারী পদক্ষেপের বৈধতা পুনর্বিবেচনা করা যায়। ব্যারিস্টার হোসেনের পাশাপাশি সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুবও পিটিশনকারীদের পক্ষে উপস্থিত হয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আনিক আর. হক আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
পিটিশনের মূল দাবি হল, নির্বাচনের পূর্বে এনসিটি চুক্তি সম্পন্ন করা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের একধরনের উচ্চ‑হ্যান্ডেডনেস, স্বেচ্ছাচারিতা এবং দুর্নীতিপূর্ণ ক্ষমতার ব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হবে। পিটিশনকারীরা যুক্তি দেন যে, এই সময়ে চুক্তি স্বাক্ষর করলে জনসাধারণের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ভবিষ্যতে অনিবার্য আইনি জটিলতা সৃষ্টি হবে। তারা আরও উল্লেখ করেন যে, আপিলের অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত চুক্তি প্রক্রিয়া স্থগিত না করা হলে অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হতে পারে।
সর্বোচ্চ আদালতের চেম্বার জাস্টিস মো. রেজাউল হকের পূর্ববর্তী রায়ে একই ধরনের পিটিশনের জন্য “কোনো আদেশ নয়” বলা হয়েছিল এবং পিটিশনকারীদের উচ্চ আদালতের শংসাপত্র পাওয়ার পর আপিলের অনুমতি চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। একই দিনে উচ্চ আদালত ডি.পি. ওয়ার্ল্ডকে চুক্তি প্রদানকে চ্যালেঞ্জ করা রিট পিটিশন প্রত্যাখ্যান করে, ফলে সরকারী পদক্ষেপের বৈধতা নিশ্চিত হয়। এই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন পিটিশন দাখিল করা হয়, যা চুক্তির বৈধতা পুনরায় প্রশ্নবিদ্ধ করে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকার ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো পরিকল্পিত হস্তান্তরের কারণে শনিবার চট্টগ্রাম বন্দর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। শ্রমিকদের প্রতিবাদে টার্মিনালের কাজ সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়, যা দেশের রপ্তানি-আমদানি শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে। কর্মী সংগঠনগুলো দাবি করে যে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে যথাযথ পরামর্শ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা দরকার।
পিটিশনের শোনার তারিখ মঙ্গলবার নির্ধারিত হয়েছে, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। যদি আদালত স্থিতি বজায় রাখার আদেশ না দেয়, তবে সরকারকে চুক্তি সম্পন্ন করতে বাধ্য করা হতে পারে, যদিও নির্বাচনের ফলাফল এখনও অনিশ্চিত। অন্যদিকে, যদি আদালত পিটিশনের পক্ষে রায় দেয়, তবে চুক্তি প্রক্রিয়া থেমে যাবে এবং সরকারকে নতুনভাবে অনুমোদন প্রাপ্তি বা বিকল্প পরিকল্পনা বিবেচনা করতে হবে।
এই মামলাটি দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর প্রশ্ন তুলেছে। এনসিটি প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকীকরণ করার লক্ষ্য থাকলেও, চুক্তি প্রক্রিয়ার বৈধতা ও জনসাধারণের স্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।
সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, ডি.পি. ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি আন্তর্জাতিক মানের লগিস্টিকস উন্নয়নে সহায়ক এবং দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে বলে যুক্তি দেওয়া হয়। তবে পিটিশনকারীরা জোর দিয়ে বলেন যে, নির্বাচনের সময়ে এমন বড় চুক্তি স্বাক্ষর করা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে এবং জনমতকে বিভক্ত করতে পারে।
আসন্ন শোনার পর, উভয় পক্ষের আইনজীবীরা আদালতের রায়ের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন। পিটিশনকারীরা আপিলের অনুমতি পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে পুনরায় চ্যালেঞ্জ করার সম্ভাবনা উন্মুক্ত রেখেছেন। সরকারও যদি রায়ের বিরোধিতা করে তবে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারে।
সর্বোচ্চ আদালতের রায় দেশের অবকাঠামো প্রকল্পের আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে, যা পরবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ও নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, এনসিটি চুক্তির স্থিতি বজায় রাখা বা বাতিল করা উভয়ই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও জনমতকে প্রভাবিত করবে।



