রবিবার নরওয়ে সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ডলারে এক মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (UNHCR)কে সমর্থন জানায়। এই তহবিলটি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় বারো লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য সরাসরি ব্যবহার করা হবে। UNHCR এই অর্থায়নকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে এটি ২০২৫-২০২৬ আর্থিক বছরের বৈশ্বিক বাজেটের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
UNHCR উল্লেখ করেছে যে ২০২৫ সালে মানবিক তহবিলের হ্রাসের ফলে শরণার্থী ক্যাম্পে সেবা কমে যাওয়া এবং ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। তাই এই অতিরিক্ত তহবিলটি জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রম বজায় রাখতে এবং বাড়তে থাকা সুরক্ষা ও মানবিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সংস্থার প্রতিনিধির মতে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নবম সংকটবছরে তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক সমর্থন পূর্বের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
নরওয়ের এই অনুদান শিক্ষার সুযোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জীবিকাভিত্তিক প্রশিক্ষণকে সমর্থন করবে, যা শরণার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তাদের স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগে মনোবল বজায় রাখতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, তহবিলটি নারীবিশেষে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবা উন্নত করার জন্যও ব্যবহার করা হবে।
নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরালদ গুলব্র্যান্ডসেনের মতে, নরওয়ে এবং UNHCR অধিকারভিত্তিক, নীতিগত এবং বহুপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি ভাগ করে নেয়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে এই সহযোগিতা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সমর্থন প্রদান করে, যা মানবিক নীতি ও মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গুলব্র্যান্ডসেন আরও উল্লেখ করেছেন যে নরওয়ে রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং তাদের স্বনির্ভরতা বাড়াতে UNHCR-এর কার্যক্রমে অংশ নিতে গর্বিত।
নরওয়ের তহবিলের অংশ SAFE+2 (Safe Plus Two) নামে একটি যৌথ কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হবে, যার লক্ষ্য শরণার্থীদের পরিবেশবান্ধব রান্নার জ্বালানি সরবরাহ করা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে কাঠের ওপর নির্ভরতা কমে ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী পরিবেশের ওপর চাপ হ্রাস পাবে, পাশাপাশি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নরওয়ের এই পদক্ষেপটি অন্যান্য দেশগুলোর দান কার্যক্রমের সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য তহবিল প্রদান করেছে। তবে নরওয়ের ফোকাস বিশেষভাবে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে, যা দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।
বিশ্বব্যাপী মানবিক তহবিলের হ্রাসের প্রবণতা বিবেচনা করে, নরওয়ের এই অনুদানটি একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জরুরি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সমাধানের জন্য ভিত্তি গড়ে তুলবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে নরওয়ের এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক দান দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক এবং অন্যান্য দাতা দেশের জন্য উদাহরণস্বরূপ কাজ করতে পারে।
UNHCR-এর মতে, এই তহবিলের মাধ্যমে ক্যাম্পে শিক্ষা কেন্দ্র, পেশাগত প্রশিক্ষণ শিবির এবং জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্প চালু করা হবে, যা শরণার্থীদের স্বনির্ভরতা বাড়াবে। একই সঙ্গে, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে, বিশেষ করে নারীদের জন্য সুরক্ষিত স্থান ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
নরওয়ের এই উদ্যোগের পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে ২০২৬ সালের শেষের দিকে তহবিলের ব্যবহার পর্যালোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সমর্থন প্রদান করা হবে। UNHCR এবং নরওয়ের মধ্যে চলমান সমন্বয় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে যে তহবিলটি সর্বোচ্চ প্রভাবের সঙ্গে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় অবদান রাখছে।
সারসংক্ষেপে, নরওয়ের এক মিলিয়ন ডলার অনুদান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের স্বনির্ভরতা ও নিরাপদ পুনর্বাসনের পথে সহায়তা করবে।



