সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় অবস্থিত গোয়াহরি বিলে শীতের সকালে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই বছর বিলে পানির স্তর হ্রাসের ফলে ঐতিহ্যবাহী তারিখের প্রায় পনেরো দিন আগে, ইংরেজি নববর্ষের দিনে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়। একই সময়ে সিলেট আবহাওয়া অফিসে রেকর্ড করা সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মৃদু শৈত্যপ্রবাহের শর্ত পূরণ করে।
পলো বাওয়া উৎসবের মূল উদ্দেশ্য হল বাঁশ ও বেতের তৈরি পলো ব্যবহার করে গ্রামবাসী ও আশেপাশের মানুষকে একত্রে মাছ শিকারের আনন্দে যুক্ত করা। এই প্রথা বহু বছর ধরে গোয়াহরি গ্রামের পূর্বপুরুষদের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে চলে আসছে এবং প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে থাকে।
বছরের এই সময়ে বিলে পানির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া সত্ত্বেও, এই বছর অতিরিক্ত হ্রাসের কারণে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে উৎসবটি আগেই চালু করতে বাধ্য করে। পানির স্তর হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামবাসীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে, তবে ঐতিহ্য রক্ষা করার ইচ্ছা তাদেরকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
সিলেটের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞের মতে, শীতের তীব্রতা এই বছর তুলনামূলকভাবে বেশি, ফলে তাপমাত্রা রেকর্ডের নিচে নেমে যায়। মৃদু শৈত্যপ্রবাহের ফলে রাতের তাপমাত্রা হ্রাস পায়, যা মাছের আচরণে প্রভাব ফেলে এবং শিকারের ফলাফলকে সীমিত করে।
উৎসবের সূচনা সকাল দশটায় হয়, যখন গোয়াহরি গ্রামের সব বয়সের মানুষ এবং পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে আসা আত্মীয়স্বজন একত্রিত হয়। সবাই পলো হাতে নিয়ে বিলে প্রবেশ করে, এবং একে অপরকে উৎসাহিত করে মাছ ধরার জন্য প্রস্তুত হয়।
বিলের পানির পরিমাণ কম হওয়ায় অনেক শিকারীকে খালি হাতে ফিরে আসতে হয়। পানির স্তর হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মাছের সংখ্যা কমে যায়, ফলে বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী দীর্ঘ সময় ধরে পানিতে থাকতে পারে না। তবু কিছু অংশগ্রহণকারী সফলভাবে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ ধরতে সক্ষম হয়।
ধরা মাছের মধ্যে বোয়াল, কাতলা, রুই, কার্ফু, শোল, গণিয়া, মিরকা এবং কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত। এই প্রজাতিগুলি স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং উৎসবের সময় বিশেষভাবে চাহিদা থাকে।
এই বছরের সবচেয়ে বড় বোয়াল মাছটি রাজু আহমদ ধরেন, যিনি গোয়াহরি গ্রামের আব্দুল মতিনের পরিবারের সদস্য। বড় বোয়ালটির সঙ্গে তিনি একাধিক শোল ও কার্ফু মাছও ধরতে সক্ষম হন, যা উপস্থিত সকলের মধ্যে প্রশংসা পায়।
পাঁচ বছর বয়সী মরিয়ম বেগম হাসিমাখা মুখে বললেন, “আমার বাবা আজ চারটি মাছ ধরেছেন।” তার উচ্ছ্বাস গ্রামবাসীর মধ্যে উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রবাসী রেজাউল করিম দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেন এবং বোয়াল ও কাতলা সহ একাধিক মাছ শিকারের সুযোগ পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।
একই সময়ে লাল মিয়া, ইকবাল হোসেন এবং মনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেন, শীতের তীব্রতা এবং কম পানির কারণে অনেক শৌখিন শিকারী দীর্ঘ সময় পানিতে থাকতে পারেননি। তারা বলেন, পানির স্তর হ্রাসের ফলে মাছের ঘনত্বও কমে গেছে, যা শিকারের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে।
গোয়াহরি বিলে পলো বাওয়া উৎসবের এই সংস্করণটি স্থানীয় ঐতিহ্যকে বজায় রাখার পাশাপাশি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের মুখে সম্প্রদায়ের সংহতি ও অভিযোজন ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। ভবিষ্যতে পানির স্তর ও শীতের তীব্রতা বিবেচনা করে উৎসবের সময়সূচি সমন্বয় করা হতে পারে, তবে এই প্রথা বজায় রাখার ইচ্ছা গ্রামবাসীর মধ্যে অটুট রয়ে যাবে।



