ঢাকা মহানগরের গণপরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ আইন খসড়া চূড়ান্ত করা হচ্ছে, যা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। আইনটি বাস সেবা পরিচালনা ও বিশেষ অধিকার সংক্রান্ত বিস্তৃত কাঠামো গড়ে তুলতে চায়।
এই উদ্যোগের মূল ভিত্তি ৩০ ডিসেম্বর ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) তে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় নির্ধারিত হয়েছে। তেজগাঁওয়ের ডিটিসিএ ভবনে ‘প্রিপেয়ারডনেস ফর বাস সেক্টর রিফর্ম অব ঢাকা সিটি’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অতিরিক্ত সচিবের বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়েছে যে ডিটিসিএয়ের পরিকল্পনার বাইরে কোনো পৃথক রুট পারমিট আর অনুমোদন করা হবে না। অপারেটরদের মধ্যে অনিয়মিত প্রতিযোগিতা বন্ধ করে, যাত্রী সেবার মান উন্নত করতে কোম্পানি ভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আখতার সভার সভাপতিত্ব করেন এবং উল্লেখ করেন যে বর্তমানে ঢাকা শহরে চলমান অনেক বাসের ফিটনেস সনদ অনুপস্থিত, পাশাপাশি বেশ কিছু বাস রুট পারমিট ছাড়াই সেবা দিচ্ছে। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে ডিটিসিএ ৯টি ক্লাস্টার ও ৪২টি রুটের মাধ্যমে ২২টি কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনার প্রস্তাবনা তৈরি করেছে।
প্রস্তাবিত কাঠামোর প্রথম ধাপ হিসেবে ডিটিসিএ, ঢাকা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (ডিএমপি) এবং বাসমালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ৩২টি রুটে একমত হয়েছে। ঐ রুটের তালিকা ডিটিসিএর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে, যা জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য।
কর্মশালায় গণপরিবহনের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়। চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে মহানগরে গণপরিবহন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা, ই-টিকেটিং সিস্টেমের বাস্তবায়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি সংযোজন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা ও আইনি কাঠামো।
এই চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানে প্রণীত সুপারিশগুলো সংকলন করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সুপারিশগুলোতে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজের আইনি ভিত্তি দৃঢ় করা, ই-টিকেটিং প্ল্যাটফর্মের দ্রুত চালু করা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কর্মশালার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আসিফ‑উজ‑জামান খান। তাঁর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে সিস্টেমিক রিফর্ম ছাড়া বর্তমান অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় এবং আইনি কাঠামোর পুনর্গঠন জরুরি।
কর্মশালায় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বাসমালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সবাই একমত যে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ মডেল বাস সেবার গুণগত মান ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে।
ডিটিসিএর পরিকল্পনা অনুযায়ী রুট ফ্র্যাঞ্চাইজের অধীনে প্রতিটি রুটে একক কোম্পানি দায়িত্ব নেবে, যা অপারেটরদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমাবে এবং রুটের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে ফিটনেস সনদ ও রুট পারমিটের কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
প্রস্তাবিত আইনের চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী ধাপে আইনটি সংসদে উপস্থাপন করে অনুমোদন প্রাপ্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা অনুমানিতভাবে কয়েক মাসের মধ্যে সম্পন্ন হতে পারে।
শাসনকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এই রিফর্মকে ঢাকা শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে দেখছে। রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন হলে বাসের নিরাপত্তা, সময়নিষ্ঠতা এবং সেবার মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আশা করা যায়।



