বিমান পরিচালনা পর্ষদ গত মঙ্গলবার ১৪টি বোয়িং জেট কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বিমানবহরের ভবিষ্যৎ নৌকাপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারস্পেস শিল্পের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হবে।
গত দুই বছর ধরে দেশের বিমান বহরের আধুনিকীকরণে ইউরোপীয় এয়ারবাস এবং আমেরিকান বোয়িংয়ের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল। পূর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ১০টি এয়ারবাস জেটের ক্রয় পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল, তবে ২০২৪ সালের গৃহযুদ্ধের পর সরকার পরিবর্তন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রভাবের ফলে অর্ডারটি শেষ পর্যন্ত বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকেছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৩-এ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো ঢাকা সফরে শীর্ষ স্তরে এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি বড় জেটের ক্রয় প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা করেন। একই সময়ে এয়ারবাসের ৮টি যাত্রীবাহী ও ২টি পণ্যবাহী জেটের সম্ভাব্য ক্রয়ের বিষয়টি পর্যালোচনার অধীনে ছিল, আর বোয়িংও যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের হুমকি থেকে রক্ষা পেতে প্রস্তাবনা দিয়ে সক্রিয় হয়।
গণঅভ্যুত্থানের পর শীঘ্রই interim সরকার ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ শুল্ক থেকে বাঁচতে জুলাই মাসে ২৫টি বোয়িং জেটের ক্রয় ঘোষণা করে। এই ঘোষণার ফলে এয়ারবাসের ১০টি বড় জেটের প্রতিশ্রুতি আবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোও চাপ বাড়ায়।
ইন্টারিম সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জুনে যুক্তরাজ্য সফরের সময় এয়ারবাসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভাউটার ভ্যান ভার্সের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর এয়ারবাসের প্রতিনিধিরা সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখে। নভেম্বরের শুরুতে ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একত্রে এয়ারবাসকে বিক্রির প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন।
এই প্রেক্ষাপটে বিমান পরিচালনা পর্ষদ ১৪টি বোয়িং জেটের ক্রয়কে অগ্রাধিকার দেয়ার কারণকে দুই দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছে। প্রথমত, বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতি থেকে রক্ষা পাবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। দ্বিতীয়ত, বোয়িংয়ের প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনগুলোর কার্যকারিতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা যায়। বোয়িং জেটের ক্রয় সাধারণত উচ্চ মূলধন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদী ফাইন্যান্সিং চুক্তি জড়িত থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো থেকে ক্রেডিট সুবিধা পাওয়া সম্ভব, যা দেশের বাণিজ্যিক ঋণভারকে সাময়িকভাবে হ্রাস করতে পারে। এছাড়া, বোয়িংয়ের সরবরাহকারী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও স্পেয়ার পার্টস শিল্পের বিকাশে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি না করা দেশের ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করবে এবং ভবিষ্যতে ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও সেবা থেকে বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারকে বিকল্প কৌশল গড়ে তুলতে হবে, যেমন দ্বিপাক্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি বা যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, বোয়িং জেটের ক্রয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রুটের সম্প্রসারণে সহায়ক হবে, বিশেষত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চ চাহিদা সম্পন্ন গন্তব্যে। নতুন জেটের সক্ষমতা ও জ্বালানি দক্ষতা বর্তমান ফ্লিটের তুলনায় বেশি হওয়ায় অপারেশনাল খরচ কমবে এবং টিকিটের মূল্য প্রতিযোগিতামূলকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
তবে, শুল্ক নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তন এখনও অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শুল্ক নীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক নীতি এবং গ্লোবাল সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা বাংলাদেশের বিমান শিল্পের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই, সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যাতে একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমে এবং বহুমুখী বিকল্প বজায় থাকে।
সংক্ষেপে, বিমান পরিচালনা পর্ষদের ১৪টি বোয়িং জেটের ক্রয় সিদ্ধান্ত দেশের এয়ারলাইন শিল্পের আধুনিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এটি যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারস্পেস বাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াবে, আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা প্রদান করবে, তবে একই সঙ্গে ইউরোপীয় বিকল্পের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করবে। ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন কীভাবে দেশের বাণিজ্যিক বিমানবহরের কার্যকারিতা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব ফেলবে, তা পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।



