সোমবার, ঢাকার পূর্বাঞ্চলে সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ব্যাংকিং খাতের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেন। তিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাগত দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এই বক্তব্য ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।
আহমেদ উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা আগামী বছরগুলোতে বাড়তে পারে। এসব বাধা মোকাবিলায় সুদৃঢ় শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তিনি ব্যাংকগুলোকে সক্রিয়ভাবে এই ঝুঁকিগুলো পরিচালনা করতে আহ্বান জানান।
ব্যাংক কর্মী ও কর্মকর্তাদের আর্থিক নৈতিকতা নিশ্চিত করাও তার অন্যতম অগ্রাধিকার। নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কঠোর আচরণবিধি প্রয়োগের মাধ্যমে নৈতিক মানদণ্ড উন্নত করা সম্ভব। নৈতিকতা শক্তিশালী হলে গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
সোনালী ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক পরিসংখ্যানও উপদেষ্টার বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্যাংকের মোট আমানত ১,৭৯,৮৭৮ কোটি টাকা, যা প্রায় দুই কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সময়ে ঋণ পরিমাণ ১,৪৭,৭২৩ কোটি টাকা।
তবে, এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৫.৩৪ শতাংশের নন‑পারফরমিং ঋণ (এনপিএল) হার, যা নিয়ন্ত্রক সীমার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। উচ্চ এনপিএল হার ব্যাংকের সম্পদ গুণগত মানকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আহমেদ এই সমস্যাকে সমাধানের জন্য ত্বরিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা জোর দেন।
সোনালী ব্যাংক আগামী আর্থিক বছরে এনপিএল হার দশ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তিনি এই লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জিং হলেও বাস্তবসম্মত বলে ব্যাখ্যা করেন। কঠোর ক্রেডিট মূল্যায়ন এবং ঋণ পুনরুদ্ধার কৌশল এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এনপিএল হ্রাসে ব্যর্থতা পুরো ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য সিস্টেমিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। খারাপ ঋণ বাড়লে ব্যাংকের ঋণদানের সক্ষমতা হ্রাস পায়, যা উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহ কমিয়ে দেয়। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়ে। তাই সম্পদ গুণগত মান বজায় রাখা দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
আহমেদের মন্তব্য দেশের ব্যাংকিং খাতের বিস্তৃত প্রবণতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংকই ঋণ গুণগত মানের অবনতি এবং তরলতার চাপের মুখে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব সমস্যার সমাধানে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার নির্দেশ দিচ্ছে। উপদেষ্টার বক্তব্য এই নিয়ন্ত্রক উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক গতিবিধি ক্রেডিট বরাদ্দে প্রভাব ফেলতে পারে। আহমেদ ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক চাপের মুখে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নিতে এবং জনস্বার্থ রক্ষায় জোর দেন। স্বচ্ছ ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন তদারকি কমিটি গঠন এ ধরনের হস্তক্ষেপ কমাতে সহায়ক হবে।
ডিজিটাল রূপান্তরকে স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স ঋণ পর্যবেক্ষণ ও প্রাথমিক সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে পারে। ফিনটেক সমাধানের বিস্তৃত গ্রহণ ব্যাংকের কার্যকরিতা এবং ত্রুটি হ্রাসে সহায়তা করবে।
বাজার বিশ্লেষকরা আহমেদের বক্তব্যকে ব্যাংক শেয়ারের মূল্যায়নে নতুন দৃষ্টিকোণ হিসেবে দেখছেন। এনপিএল হ্রাসের স্পষ্ট পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াতে পারে। তবে সমস্যার অব্যাহত থাকলে শেয়ার মূল্যে চাপ এবং ক্রেডিট রেটিংয়ে প্রভাব পড়তে পারে। তাই ব্যাংকের কর্মক্ষমতা সরাসরি বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।
উপদেষ্টা শেষ করে সকল ব্যাংককে শাসনব্যবস্থা, নৈতিক মান এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই দিকগুলোতে অগ্রগতি আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি। ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই নীতিগুলোই মূল চাবিকাঠি হবে।
সোনালী ব্যাংকের লক্ষ্য অর্জন এবং সমগ্র সেক্টরের সংস্কার আগামী বছরগুলোতে পর্যবেক্ষণযোগ্য হবে। নিয়মিত অগ্রগতি রিপোর্ট এবং তদারকি প্রক্রিয়া এই রূপান্তরের সাফল্য মাপবে। সকল স্টেকহোল্ডারকে এই পরিবর্তনের দিকে মনোযোগী হতে বলা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য ব্যাংকিং খাতের জন্য স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছে। তিনি সোনালী ব্যাংকের নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং সমগ্র সেক্টরের সম্ভাব্য বাধা উভয়ই তুলে ধরেছেন। এই বার্তা ব্যাংকগুলোকে কৌশলগতভাবে পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত হতে নির্দেশ দেবে।



