ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. সাব্বির ফয়েজ সোমবার দুদকের তিনটি পৃথক আবেদন বিবেচনা করে ছয়জনের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আদেশ দেন। এতে পেট্রোবাংলার পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (ইলিএফএস) এর পাঁচজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. রিয়াজ হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ গ্যাস সংযোগ/পুনঃসংযোগ, গ্যাস বিল মওকুফ, নিয়োগ ও পদোন্নতি জালিয়াতি, ঠিকাদার বিলের অতিরিক্ত প্রদান এবং বিদেশি সংস্থাকে গ্যাস মজুদ সংক্রান্ত তথ্য বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ইলিএফএসের চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এমদাদুল ইসলাম, কোম্পানি সচিব রেজাউল ইসলাম, হেড অব রিকভারি আবু মো. আল মামুন এবং আইডিসিএল (ইডিসিএল) এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আ. সামাদ মৃধা-কে একই সময়ে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ইলিএফএসের সহকারী পরিচালক পিয়াস পালের মতে, রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্যাস সংযোগের অবৈধ পুনঃসংযোগ, গ্যাস বিল মওকুফের মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে বিশাল অর্থ সঞ্চয় এবং বিদেশি গ্যাস মজুদ তথ্য বিক্রির মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টির অভিযোগে তদন্ত চলছে। এই ধরনের আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি অনুসন্ধানের জন্য অভিযুক্তদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া রোধ করা জরুরি বলে আদালত সিদ্ধান্ত নেয়।
আদালতে সামাদ মৃধার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন সংস্থার সহকারী পরিচালক নুরুল ইসলাম দাখিল করেন। আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মৃধার বিরুদ্ধে পারস্পরিক যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে তদন্ত চালু রয়েছে।
গোপন সূত্র ও ওপেন সোর্স তথ্য থেকে জানা যায়, মৃধা ইডিসিএলের বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় টেন্ডার বাণিজ্য করে অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করার চেষ্টা করছেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, যদি মৃধা বিদেশে পালিয়ে যান তবে তদন্তের গতি ধীর হয়ে যেতে পারে, তাই তার বিদেশযাত্রা রোধ করা প্রয়োজন।
ইলিএফএসের উপপরিচালক মশিউর রহমানের পক্ষ থেকে আরেকজন অভিযুক্তের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন দাখিল করা হয়েছে। এতে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের প্রাক্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার (পি.কে.) হালদার এবং তার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে তদন্ত চলছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশান্ত কুমার হালদারকে নিয়ে গৃহীত তদন্তে দেখা গেছে, তিনি ও তার সহযোগীরা বহু টেন্ডার প্রকল্পে জালিয়াতি করে বিশাল অর্থ সঞ্চয় করে তা বিদেশে স্থানান্তর করার পরিকল্পনা করছিলেন। এই ধরনের আর্থিক অপরাধের তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিদেশে পালিয়ে যাওয়া রোধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
মেট্রোপলিটন জজের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তদের বিদেশে যাত্রা রোধ না করা হলে তদন্তের সময়সীমা বাড়তে পারে এবং প্রমাণ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। তাই আদালত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চেয়েছেন।
আদালত এই সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আইনগত বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত আপডেট প্রদান করতে। এছাড়া, তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং সাক্ষী সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।
এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে রফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য অভিযুক্তদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বিদেশে বাসস্থান বা কোনো ধরনের বিদেশি আর্থিক লেনদেনের অনুমতি সীমাবদ্ধ থাকবে। আদালত ভবিষ্যতে প্রমাণের ভিত্তিতে অতিরিক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা রাখবে।
দু’সপ্তাহের মধ্যে আদালত থেকে আরেকটি শুনানি নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদনুযায়ী অভিযোগের প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি নির্ধারণের জন্য রায় শোনানো হবে। এই পর্যায়ে আদালত ও তদন্তকারী সংস্থার সমন্বিত কাজের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা রক্ষার লক্ষ্য স্পষ্ট।



