বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ২ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) সোনালী ব্যাংকের ২০২৬ বার্ষিক সম্মেলনে ঋণ বিতরণ ও পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা রাখে, তবে সময়মতো আদায়ে ব্যর্থতা তাদের কার্যকারিতা হ্রাস করে।
গভর্নর বলেন, সঠিক গ্রাহক নির্বাচন করে ঋণ দিলে অনাদায়ী ঋণের ঝুঁকি কমে যায় এবং ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল আমানত সংগ্রহ করেই নয়, সেগুলোকে বৃহৎ অর্থনীতিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করাও জরুরি; না হলে অর্জন সীমিত হয়ে যায়।
সোনালী ব্যাংক বর্তমানে ঋণ প্রদানকে সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করছে, তবে তিনি আরও সাহসীভাবে ঋণ কার্যক্রম বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে, কনজিউমার লেন্ডিং ও হাউস লেন্ডিং আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকা সরকারি ব্যাংকগুলো এখনও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি।
কনজিউমার লেন্ডিংয়ের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অগ্রগতি সীমিত, ফলে বৃহৎ পরিসরে কাজ করার সুযোগ রয়ে গেছে। এই দিক থেকে সোনালী ব্যাংকের ভূমিকা বাড়ালে গ্রাহক ভিত্তি বিস্তৃত হবে এবং বাজারের চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।
গভর্নর সোনালী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ব্যাংকে রূপান্তরের ওপর জোর দেন। বর্তমানে ব্যাংকটি আংশিকভাবে কমার্শিয়াল ব্যাংকিং নীতিতে পরিচালিত হচ্ছে; সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করলে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব হবে।
গত বছরের মুনাফা সম্পর্কে তিনি জানান, এই আয় ব্যাংকের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি পূরণে সহায়তা করবে। ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংক লভ্যাংশ প্রদানেও সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
সরকারের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংককে প্রকৃত বাণিজ্যিক নীতি স্বাধীনতা প্রদান এবং পরবর্তী সরকারও এই দিক বজায় রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংককে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এনপিএল (নন‑পারফরমিং লোন) পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি আশাবাদী সুরে বলেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১৮ শতাংশের উপরে থেকে কমে এসেছে এবং আরও হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি, যাতে অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ হয়।
ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখতে হবে এবং মাঠপর্যায়ে সক্ষম উদ্যোক্তা ও শক্তিশালী এসএমই গ্রাহকদের চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রপ্তানি খাতে সোনালী ব্যাংকের ভূমিকা জোরদার করার আহ্বানও তিনি জানান।
বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক রূপান্তর সম্পদ গুণমান ও মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করবে, যা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারে এবং এসএমই ও রপ্তানিকারকদের জন্য ক্রেডিট সহজলভ্য করবে। তবে দ্রুত ঋণ বৃদ্ধি যথাযথ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া পুনরায় অনাদায়ী ঋণ বাড়াতে পারে, যা সতর্কতা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, গভর্নরের মন্তব্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে থাকা সরকারি ব্যাংকগুলোর বাণিজ্যিকীকরণ ও ঋণ নীতি পুনর্গঠনের সংকেত দেয়। তিনি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সঙ্গে ঋণ বৃদ্ধির, রেমিট্যান্স বাড়ানোর এবং রপ্তানি সমর্থনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের গতিপথে নতুন দিকনির্দেশনা সৃষ্টি করবে।



