ড. আহসান এইচ মনসুর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সোমবার আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও এই ব্যাংকগুলো ঋণ প্রদানে সক্ষম, তবে সময়মতো আদায়ে দুর্বলতা দেখা যায়।
গভর্নর জোর দিয়ে বলেন, গ্রাহক নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে পরিচালনা করলে ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি ঋণ প্রদান কৌশলে সতর্কতা ও বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
তিনি অতীতের একটি পর্যবেক্ষণ শেয়ার করেন, যেখানে ২০০০ সালের পূর্বে সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবাহ সীমিত ছিল এবং তা কোনো টেকসই মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারেনি। সেই সময়ের সীমাবদ্ধতা বর্তমান নীতির পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যাখ্যা করেন, ব্যাংক যদি আমানত সংগ্রহ করেও তা বৃহৎ অর্থনীতিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার না করতে পারে, তবে তার অর্জন সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। তাই তিনি সোনালী ব্যাংকের বর্তমান সতর্ক ঋণ বিতরণকে প্রশংসা করে, আরও সাহসিকতার সঙ্গে ঋণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।
গভর্নর সোনালী ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রূপান্তরের ওপর জোর দেন। বর্তমানে ব্যাংকটি আংশিকভাবে বাণিজ্যিক নীতিতে পরিচালিত হলেও, তাকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা দরকার। এই পরিবর্তন ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গত বছরের মুনাফা সম্পর্কে তিনি বলেন, এই আয় ব্যাংকের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে। মুনাফার এই অবদান ভবিষ্যতে সোনালী ব্যাংককে লভ্যাংশ প্রদান করার সক্ষমতা বাড়াবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন।
গভর্নর আরও উল্লেখ করেন, সরকার সোনালী ব্যাংককে প্রকৃত বাণিজ্যিক নীতিতে স্বাধীনভাবে পরিচালনার অনুমতি দেবে এবং পরবর্তী সরকারও এই নীতি বজায় রাখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন। এই ধারাবাহিকতা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে সোনালী ব্যাংককে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, এ বিষয়েও তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দেন। রেমিট্যান্সের বৃদ্ধি ব্যাংকের লিকুইডিটি ও ঋণ প্রদানের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
খেলাপি ঋণ (এনপিএল) পরিস্থিতি নিয়ে তিনি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন। সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ইতোমধ্যে ১৮ শতাংশ থেকে কমেছে এবং আরও হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই উন্নতি বজায় রাখতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ বাড়ানো জরুরি, তিনি জোর দেন।
ড. আহসান এইচ মনসুর শেষ কথা হিসেবে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। তিনি মাঠপর্যায়ে সক্ষম উদ্যোক্তা ও সুদক্ষ এসএমই গ্রাহকদের সনাক্ত করে ঋণ প্রদানকে লক্ষ্যবস্তু করতে বলছেন।
একই সঙ্গে তিনি রফতানি খাতে সোনালী ব্যাংকের ভূমিকা শক্তিশালী করার আহ্বান জানান। রফতানি সমর্থন ব্যাংকের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের বাণিজ্যিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
গভর্নরের এই মন্তব্যগুলো সোনালী ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কৌশল ও নীতিমালার দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। ব্যাংকটি এখন সতর্কতা ও সাহসিকতার সমন্বয়ে ঋণ নীতি পুনর্গঠন করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রস্তুত।



