ঢাকার পুরনো পল্টন লাইনের ৫০ নম্বর ঘরে, থিয়েটার পোস্টার, ফটোগ্রাফ, টিকিট, ফ্লায়ার, স্মারক, ফোল্ডার, বই এবং পুরনো নথিপত্রে ভরা তাকগুলো একত্রে ইতিহাসের গোপন কোষের মতো। ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আর্কাইভ, দেশের নাট্য ঐতিহ্যের স্মৃতি রক্ষা করতে চার দশক ধরে কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিলেন ড. বাবুল বিশ্বাস, যিনি থিয়েটার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে এই উদ্যোগে হাত বাড়িয়ে দেন। উত্পাল দত্তের পরামর্শে তিনি নাট্য সামগ্রী সংগ্রহের পদ্ধতি গড়ে তোলেন, যা তখন দেশের কোনো সংস্থায় দেখা যায়নি।
শুরুতে শুধুমাত্র পোস্টার সংগ্রহের মাধ্যমে কাজটি চালু হয়। তবু কোনো সরকারি সহায়তা, তহবিল বা প্রতিষ্ঠানের কাঠামো না থাকলেও, বিশ্বাসের দৃঢ়তা এবং নাট্যপ্রেমের উত্সাহে তিনি একা এই সংগ্রহ চালিয়ে যান। সময়ের সাথে সাথে এটি দেশের প্রথম নাট্য আর্কাইভে রূপ নেয়।
প্রারম্ভিক বছরগুলোতে আর্কাইভের টিকে থাকা সম্ভব হয় সমষ্টিগত সহযোগিতার মাধ্যমে। বিশিষ্ট অভিনেতা, পরিচালক ও নাট্যকার মামুনুর রশিদ ড. বিশ্বাসকে পরামর্শ দেন, তার অফিসে (২৬ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) সামগ্রী সংরক্ষণের জন্য স্থান প্রদান করেন। এই সহায়তা আর্কাইভকে একা না থেকে একটি সম্প্রদায়ের অংশে পরিণত করে।
অরণ্য থিয়েটার গ্রুপের সদস্যরা আর্কাইভের ‘প্রসবোত্তর যত্ন’ প্রদান করেন। তারা সংগ্রহের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করেন, নতুন পোস্টার, ফ্লায়ার এবং নথি সংগ্রহে সহায়তা করেন। এভাবে আর্কাইভ একক উদ্যোগ থেকে সমন্বিত সংরক্ষণ প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়।
বড় নামের নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদারও আর্কাইভের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার সমর্থন ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আর্কাইভের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পায় এবং নতুন সংগ্রহের দরজা খুলে যায়।
আর্কাইভের সংগ্রহে শুধু পোস্টার নয়, নাট্যকার ও অভিনেতাদের ব্যক্তিগত স্মারকও অন্তর্ভুক্ত। একটি ফটোগ্রাফে দেখা যায় মামুনুর রশিদ, উত্পাল দত্ত, তার স্ত্রী শোভা সেন, কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত এবং ড. বাবুল বিশ্বাস একসাথে দাঁড়িয়ে আছেন। এই ছবিটি আর্কাইভের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে চিত্রিত করে।
প্রায় চার দশক ধরে, আর্কাইভের তাকগুলোতে নাট্য জগতের উত্থান-পতন, নাটকের সাফল্য ও ব্যর্থতা, এবং শিল্পীদের জীবনের মুহূর্তগুলো সংরক্ষিত হয়েছে। প্রতিটি পোস্টার, টিকিট এবং ফ্লায়ার একটি নির্দিষ্ট সময়ের সাংস্কৃতিক চিত্র তুলে ধরে।
আর্কাইভের সংগ্রহের মূল লক্ষ্য হল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নাট্য ইতিহাসের সরাসরি সাক্ষী করা। ড. বিশ্বাসের মতে, নাট্য ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে দেশের সাংস্কৃতিক চেতনা দুর্বল হয়ে যায়; তাই এই নথিগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।
আজকের দিনে আর্কাইভটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল কপি তৈরির কাজেও লিপ্ত। পুরনো নথি স্ক্যান করে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আপলোড করা হচ্ছে, যাতে গবেষক ও নাট্যপ্রেমীরা সহজে প্রবেশ করতে পারেন।
আর্কাইভের পরিচালনা দল নিয়মিতভাবে কর্মশালা ও প্রদর্শনী আয়োজন করে, যেখানে তরুণ নাট্যশিল্পী ও শিক্ষার্থীরা সংগ্রহের সঙ্গে পরিচিত হয়। এসব ইভেন্টের মাধ্যমে নাট্য ইতিহাসের প্রতি নতুন আগ্রহ জাগ্রত হয়।
যারা নাট্য সংস্কৃতিতে আগ্রহী, তাদের জন্য আর্কাইভটি একটি মূল্যবান সম্পদ। আপনি যদি ঢাকায় থাকেন, তবে ৫০ পুরনো পল্টন লাইনের এই ছোট ঘরে গিয়ে সরাসরি ঐতিহাসিক সামগ্রী দেখার সুযোগ নিতে পারেন। ভবিষ্যতে নাট্য গবেষণা ও সৃজনশীল কাজের জন্য এই সংগ্রহের ব্যবহার বাড়বে বলে আশা করা যায়।



