রাশিয়ার বেসামরিক ড্রোন একটি বাসে আঘাত হানায়, যা খনি শ্রমিকদের পরিবহন করছিল, ফলে ১২ জন কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। ঘটনাটি ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, নিপ্রোপেত্রভস্ক অঞ্চলে রবিবার বিকালে ঘটেছে। ইউক্রেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেনিস শমিহাল এই আক্রমণকে ‘নিষ্ঠুর ও পরিকল্পিত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
শমিহাল জানান, আক্রান্ত বাসটি ডিটিইকে (DTEK) কোম্পানির কর্মীদের নিয়ে কাজের পালা শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। ডিটিইকে ইউক্রেনের সর্ববৃহৎ বেসরকারি জ্বালানি সংস্থা, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন, কয়লা ও প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন এবং বিদ্যুৎ বিতরণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এই সংস্থার কর্মীরা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
কেবল দুই দিন আগে, ক্রেমলিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুরোধে রবিবার পর্যন্ত ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আক্রমণ স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিয়েভ সরকারও রাশিয়ার জ্বালানি সুবিধার ওপর আক্রমণ বন্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি জানিয়ে, উভয় পক্ষের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তবে ইউক্রেনের সূত্র অনুযায়ী, এই বিরতি শুক্রবার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল, যা সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে পুনরায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের জ্বালানি ব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপের মুখে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দেশের বিদ্যুৎ গ্রিড, গ্যাস পাইপলাইন এবং তেল সংরক্ষণাগারকে প্রায় ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে এসেছে। রোয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি এখন নতুন শৈত্যপ্রবাহের মুখোমুখি, তাপমাত্রা -১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি নেমে এসেছে এবং আগামীকাল -২০ ডিগ্রি পর্যন্ত নামার সম্ভাবনা রয়েছে।
শীতের তীব্রতায় কিয়েভের প্রায় ৭০০টি অ্যাপার্টমেন্ট ভবন বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়ে গেছে, ফলে গরমের ব্যবস্থা কার্যকর নয়। এই পরিস্থিতি শীতের মৌসুমে নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। জেলেনস্কি প্রেস কনফারেন্সে উল্লেখ করেন, রাশিয়া রেলওয়ে, সেতু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, যা দেশের লজিস্টিক্স ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর কোনো বড় আকারের আক্রমণ রিপোর্ট করা হয়নি, তবে জেলেনস্কি রাশিয়ার ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ করার অভিযোগ তোলেন, যদিও তিনি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেননি। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, নিপ্রোর একটি বাড়িতে রাতের সময় ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত হয়েছেন, আর জাপোরিজিয়া শহরের একটি আবাসিক এলাকায় আরেকটি ড্রোন আক্রমণে নয়জন আহত হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণ ইউক্রেনের জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর উদ্দেশ্য বহন করে। রাশিয়ার সামরিক কৌশলকে এখনো ‘শক্তি যুদ্ধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো মৌলিক সেবাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থন শর্তে রাশিয়ার আক্রমণ বন্ধের প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অবস্থা বিবেচনা করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনো সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল যুদ্ধবিরতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং মানবিক সাহায্য দ্রুত পৌঁছানো। যদি রাশিয়া আবার আক্রমণ বাড়ায়, তবে ইউক্রেনের শীতকালীন দুর্যোগ আরও তীব্র হবে এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়বে, যা নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলবে। তাই, কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে সক্রিয় রাখতে এবং উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি পর্যবেক্ষণ করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপে, রাশিয়ার ড্রোন হামলা ইউক্রেনের জ্বালানি কর্মীদের ওপর সরাসরি আঘাত হানার পাশাপাশি দেশের শীতকালীন প্রস্তুতিকে দুর্বল করেছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার তীব্রতা বাড়াবে। ভবিষ্যতে কোনো বড় আক্রমণ এড়াতে উভয় পক্ষের প্রতিশ্রুতি পর্যবেক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।



