ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি রেকর্ড নিম্নে নেমে, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক ধীরগতির ফলে ঘটেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসা সংস্থার ঋণ বৃদ্ধি ৬.১০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা কমপক্ষে চার বছর পর সর্বনিম্ন স্তর, এবং নভেম্বরের ৬.৫৮ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়েছে।
এই পতনের পেছনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্যবস্তুও প্রাসঙ্গিক। জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ আর্থিক নীতিতে বেসরকারি ব্যবসার জন্য ঋণ বৃদ্ধির লক্ষ্য ৭.২ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছিল, যদিও জুনের শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশে পৌঁছেছিল। লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থতা বিনিয়োগের স্থবিরতা নির্দেশ করে।
মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মতি উল হাসান উল্লেখ করেন, বর্তমান সময়ে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ বা ব্যবসা সম্প্রসারণে সংকোচন দেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, “শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত ঋণ চাহিদা বাড়বে না; একটি মুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন প্রয়োজন।” এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতে তরলতা বাড়িয়ে তুলেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আশিকুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (প্রাই) এর প্রধান অর্থনীতিবিদ, যুক্তি দেন যে জাতীয় নির্বাচনের অনিশ্চয়তা ঋণ বৃদ্ধিকে ধীর করে দিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, “রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে সরাসরি প্রভাবিত করে; উদ্যোক্তারা নির্বাচন ফলাফল ও তার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ স্থগিত রাখছেন।” নির্বাচনের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত, যা আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুরাতন বেসরকারি ব্যাংক পাবলি ব্যাংক পিএলসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও মোহাম্মদ আলি জানান, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ এখনও স্থবির। তিনি যোগ করেন, “সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ধীর বাস্তবায়নও একটি কারণ।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “নির্বাচনের পর মে-জুন মাসে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ ও মূলধনী যন্ত্রপাতির চাহিদা বাড়তে পারে।”
বাংলাদেশ ব্যাংক তার জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৫ নীতিতে উল্লেখ করেছে যে, ঋণ চাহিদা হ্রাসের পেছনে বিভিন্ন উপাদান কাজ করছে, যার মধ্যে অ-ব্যাংক ডিপোজিট কর্পোরেশন ও অন্যান্য আর্থিক সেক্টরের ঋণ গ্রহণের হ্রাস, এবং চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত। এই উপাদানগুলো মিলিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, যদি রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত স্থিতিশীল না হয়, তবে ঋণ বৃদ্ধির হার লক্ষ্য থেকে আরও দূরে সরে যেতে পারে, যা উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে, ব্যাংকগুলোর তরলতা বাড়ার ফলে সুদের হার সমন্বয় ও ঋণ শর্তে পরিবর্তন আনা হতে পারে, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
সারসংক্ষেপে, ডিসেম্বর ২০২৫-এ বেসরকারি খাতের ঋণ বৃদ্ধি রেকর্ড নিম্নে নেমে, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক ধীরগতি এবং সরকারি প্রকল্পের ধীর বাস্তবায়নের সমন্বয়ে ঘটেছে। লক্ষ্য অর্জনের জন্য মুক্ত ও ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন, দ্রুত নীতি বাস্তবায়ন এবং ঋণ চাহিদা উদ্দীপনার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। ভবিষ্যতে নির্বাচনের ফলাফল ও তার পরবর্তী অর্থনৈতিক নীতির দিকনির্দেশই বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের মূল চালিকাশক্তি হবে।



