রাজশাহীর এক শিক্ষক, সুকুমার প্রামাণিক, যিনি ঢাকা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে বসবাস করেন, আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ভোটের সময় ও পরে হিংসা বাড়ার সম্ভাবনা তাদের জন্য শেষ পরীক্ষা।
বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতার রেকর্ড দেখা যায়, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সবচেয়ে বেশি আঘাত হানো হয়েছে। সম্পত্তি ধ্বংস, হত্যাকাণ্ড এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা নিয়মিতভাবে রিপোর্ট করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দাবি করে যে অধিকাংশ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিদ্বেষ নেই, তবে এ ধরনের মন্তব্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্দেহের জন্ম দেয়।
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবে সুকুমার প্রামাণিক উল্লেখ করেন যে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে রাজনৈতিক নেতাদের ওপর আস্থার মাত্রা বর্তমানে খুবই কম।
আগস্ট ২০২৪-এ ঘটিত গণঅভ্যুত্থান, যা শেখ হাসিনার সরকারকে দুর্বল করে, তার পর দেশজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে এবং হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই সময়ে হিন্দু ভোটারদের ওপর আক্রমণ বাড়ার খবর পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু ভোটাররা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে আসছেন, যা নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করে। তবে সমালোচকরা উল্লেখ করেন, ক্ষমতায় থাকাকালে দলটি সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য ভয় ছড়ানোর কৌশল ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু, আর খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সংখ্যা তদনুযায়ী কম। এই গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝখানে ফাঁদে পড়ে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে ভোটারকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞ ও সংখ্যালঘু নেতারা উল্লেখ করেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধর্মীয় পরিচয়কে ভোটার নিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে ঘরবাড়ি, উপাসনালয় এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সহ-সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, অতীতের নির্বাচনগুলোতে সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন কখনোই সম্পূর্ণভাবে থেমে যায়নি। এই নিপীড়নের কোনো সঠিক বিচার না হওয়াই পরিস্থিতি আরও খারাপ করার মূল কারণ।
পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৫২২টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এই সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে এই উদ্বেগের ফলে ভোটার অংশগ্রহণের হার কমতে পারে, যা রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যারা সংখ্যালঘু ভোটারকে মূল সমর্থন হিসেবে দেখেছে, তাদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থা এই পরিস্থিতি নজরে রাখছে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য চাপ বাড়াতে পারে। যদি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হয়, তবে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও দায়িত্বশীলতা প্রশ্নে উঠতে পারে।
সর্বোপরি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বৈধতা ক্ষুণ্ণ হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলবে।



