গরমের তাপমাত্রা, রমজান ও সেচ মৌসুমের সমন্বয়ে দেশের জ্বালানি চাহিদা শীর্ষে পৌঁছাবে, ফলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি বাড়বে বলে শিল্প সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকলে উৎপাদন ক্ষমতা পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হবে না, ফলে লোডশেডিংয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎকে পাইকারি মূল্যে কিনে, খুচরা দামে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে। এই পার্থক্যের ফলে পিডিবি বড় পরিমাণে ঋণভুক্ত এবং সরকার থেকে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চেয়েছে। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সম্পূর্ণ বকেয়া টাকা সংগ্রহ করা বাস্তবে কঠিন।
গ্যাস‑চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না হলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে না, এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা সতর্ক করেছে। তদুপরি, আর্থিক সংকটের কারণে তেল‑চালিত ও কয়লা‑চালিত কেন্দ্রগুলোতেও পর্যাপ্ত উৎপাদন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে গরমের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়বে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা মোট প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াট, যার মধ্যে আমদানি করা ক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত। তবে জ্বালানি ঘাটতির কারণে এই ক্ষমতার সম্পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না; সর্বোচ্চ উৎপাদন মাত্র ১৬,৭৯৪ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। এই বছর পর্যন্ত সর্বোচ্চ উৎপাদন প্রায় ১১,৫০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি।
লোডশেডিং মোকাবিলার জন্য দৈনিক প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন। পায়রা, রামপাল, মাতারবাড়ী, বড়পুকুরিয়া, পটুয়াখালী ও এস আলমসহ বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রাখতে হবে। গ্যাস অনুসন্ধানে অগ্রগতি না থাকায় প্রতি বছর গড়ে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।
দৈনিক গ্যাস সরবরাহের মোট পরিমাণ ২৬০ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে আমদানিকৃত লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) এবং দেশীয় গ্যাস অন্তর্ভুক্ত। দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বর্তমানে ১৭৬ কোটি ঘনফুট, যা গত বছরের একই সময়ে ১৮১ কোটি ঘনফুটের তুলনায় কম। গ্যাসের ঘাটতি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সীমিত ক্ষমতায় চালাতে বাধ্য করছে।
পিডিবি উল্লেখ করেছে, গ্যাসের ঘাটতি পূরণ না হলে লোডশেডিং এড়ানো কঠিন হবে এবং গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে, গ্যাস‑চালিত কেন্দ্রগুলোকে পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাবে, যা সরাসরি গৃহস্থালী ও শিল্পখাতে প্রভাব ফেলবে।
কয়লা‑চালিত কেন্দ্রগুলোও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সম্পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তেল‑চালিত কেন্দ্রগুলোও একই সমস্যার সম্মুখীন, ফলে গরমের মাসগুলোতে বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়বে। এই পরিস্থিতি বিদ্যুৎ বাজারে মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্রাহকদের আর্থিক চাপ বাড়াতে পারে।
শক্তি সেক্টরের বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেছেন, গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে নতুন অনুসন্ধান প্রকল্পের ত্বরান্বিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন, অন্যথায় গ্যাসের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৈচিত্র্যকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি, যাতে গরমের চাহিদা পূরণে সিস্টেমের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
সংক্ষেপে, গরমের তাপমাত্রা, রমজান ও সেচ মৌসুমের সমন্বয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা বাড়বে, আর জ্বালানি ঘাটতি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে সীমিত ক্ষমতায় চালাবে। পিডিবি ও পেট্রোবাংলা উভয়ই উল্লেখ করেছে, গ্যাসের দৈনিক প্রয়োজনীয়তা পূরণ না হলে লোডশেডিং বাড়বে এবং গ্যাস‑চালিত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন হ্রাস পাবে। সরকারী ভর্তুকি ও নতুন গ্যাস অনুসন্ধান প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়নই এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি হবে।



