একটি সাম্প্রতিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের প্রায় ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী গ্রামাঞ্চলে বসবাস করলেও, তাদের শিক্ষার গুণগত মান, সুযোগ এবং ব্যয়ের দিক থেকে শহুরে সহপাঠীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে। এই তথ্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সমতা অর্জনের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের মতে, শহরের বিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, ডিজিটাল ল্যাব, সজ্জিত বিজ্ঞানাগার এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকবৃন্দের উপস্থিতি সাধারণ। পাশাপাশি, সহশিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলির বেশিরভাগই পুরনো, ক্ষয়প্রাপ্ত ভবনে সীমিত শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে কাজ করে। শিক্ষকসংকট এবং প্রযুক্তির অভাবের ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক পাঠ্যবইয়ের বাইরে কোনো আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি পায় না। ফলে, গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা একই স্তরের জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
শিক্ষার গুণগত পার্থক্য কেবল একাডেমিক ফলাফলে নয়, শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নেও প্রভাব ফেলে। শহরের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বেশি সুযোগ পায়, যেখানে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও তথ্যের অভাবে পিছিয়ে থাকে। এই বৈষম্য সামাজিক গতিশীলতাকে ধীর করে।
বাংলাদেশ সরকার বহুবার প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, উপবৃত্তি প্রদান এবং বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মতো নীতি ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য গ্রাম ও শহরের শিক্ষার ফাঁক কমানো হলেও, বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং দুর্নীতির প্রভাবের কারণে প্রান্তিক বিদ্যালয়গুলোতে সঠিকভাবে পৌঁছায় না।
প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং তহবিলের অপচয় শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পিত প্রকল্পগুলোকে অকার্যকর করে তুলেছে। ফলস্বরূপ, অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয় এখনও জরাজীর্ণ অবকাঠামো এবং অপর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রীর সঙ্গে কাজ করে, যদিও নীতিগতভাবে সমতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
এই পরিস্থিতি একটি প্রজন্মকে তৈরি করেছে, যারা সনদধারী হলেও দক্ষতাহীন এবং কর্মবাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেও, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার অভাবে চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে, গ্রামীণ যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে গ্রাম‑শহরের বৈষম্য কমানোর কথা উল্লেখ করা হলেও, স্পষ্ট কাঠামো বা কার্যকরী পরিকল্পনা এখনও গড়ে ওঠেনি। নীতির শব্দগত দিক এবং বাস্তবিক বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ফাঁক রয়েছে, যা শিক্ষার সমতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক সমতা ও জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি। গ্রাম ও শহরের শিক্ষার মান সমান করা মানে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব পালন করা। যখন গ্রামীণ শিশুরা শহরের শিশুর মতোই আধুনিক সরঞ্জাম ও মানসম্পন্ন শিক্ষা পাবে, তখনই দেশ জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে।
এই বাস্তবতা বিবেচনা করে, শিক্ষার্থীর পরিবার ও স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, পিতামাতারা সন্তানকে বাড়িতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অনলাইন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতে পারেন, এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা বিদ্যালয়ের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তা করতে পারেন।
আপনার এলাকার বিদ্যালয়ে কোন ধরনের উন্নয়ন প্রয়োজন, এবং আপনি কীভাবে ছোট পদক্ষেপে শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে পারেন, তা নিয়ে চিন্তা করুন। এই প্রশ্নের উত্তরই গ্রাম‑শহরের শিক্ষার ফাঁক কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে।



