যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ডলার এই বছর গড়ে ৯ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে, যা গত আট বছরে সর্বনিম্ন পারফরম্যান্স। এই পতনের পেছনে ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা, অন্যান্য প্রধান মুদ্রার তুলনায় সুদের পার্থক্যের সংকোচন, এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।
বাজারের বিশ্লেষকরা এখনও আশা করছেন যে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ত্বরান্বিত হওয়া এবং ফেডের অতিরিক্ত শিথিলকরণে ডলারের অবমূল্যায়ন আগামী বছরেও চলবে। নতুন ফেড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি আরও নরমমুখী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডলার সাধারণত তখন দুর্বল হয় যখন ফেড সুদের হার কমায়, কারণ কম সুদের ফলে ডলারে ভিত্তিক সম্পদগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং মুদ্রার চাহিদা হ্রাস পায়। এই মৌলিক প্রক্রিয়াই এই বছর ডলারের তীব্র পতনের মূল কারণ।
কর্পে নামক গ্লোবাল কর্পোরেট পেমেন্টস কোম্পানির প্রধান বাজার কৌশলবিদ কার্ল শামোটা উল্লেখ করেছেন, ডলার এখনও মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতিমূল্যায়িত। তিনি বলেন, বর্তমান মূল্যায়ন বৈশ্বিক মুদ্রা বাজারের বাস্তবিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ডলারের দিকনির্দেশনা সঠিকভাবে অনুমান করা বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই মুদ্রা বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। ডলার দুর্বল হলে, যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সংস্থাগুলোর বিদেশি আয় ডলারে রূপান্তরিত হলে বেশি মূল্য পায়, ফলে তাদের মুনাফা বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ে, কারণ মুদ্রা পরিবর্তনের সুবিধা মূল সম্পদের পারফরম্যান্সের উপরে অতিরিক্ত সুবিধা দেয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ডলার সূচক কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখিয়েছে; সেপ্টেম্বরের নিম্ন স্তর থেকে সূচক প্রায় দুই শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবুও, বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদদের বেশিরভাগই ২০২৬ সালে ডলার আরও দুর্বল হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন। এই পূর্বাভাসটি নভেম্বর ২৮ থেকে ডিসেম্বর ৩ পর্যন্ত পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক জরিপের ফলাফল।
ডলারের বাস্তবিক বিস্তৃত কার্যকরী বিনিময় হার, যা বহু মুদ্রার তুলনায় মুদ্রাস্ফীতির সমন্বয় করে নির্ধারিত হয়, অক্টোবর মাসে ১০৮.৭ এ নেমে এসেছে। এটি জানুয়ারিতে রেকর্ড উচ্চ ১১৫.১ থেকে সামান্য কম, যা নির্দেশ করে যে ডলার এখনও অতিমূল্যায়িত অবস্থায় রয়েছে।
বৈশ্বিক বাজারে ডলারের অবস্থান পুনর্গঠন হলে, আমেরিকান রপ্তানিকারক ও বহুজাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিযোগিতামূলকতা বাড়বে। একই সঙ্গে, আমেরিকান ভোক্তাদের জন্য আমদানি পণ্যের দাম কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতি দমনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, ডলারের অবমূল্যায়ন বৈদেশিক ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর জন্য ঋণ পরিশোধের বোঝা বাড়াতে পারে, কারণ তাদের মুদ্রা ডলারের তুলনায় শক্তিশালী হতে পারে। ফলে, আন্তর্জাতিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিতে, ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ নীতি নির্ধারণের ধাপগুলো ডলারের গতিপথে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। যদি সুদের হার কমানো অব্যাহত থাকে, তবে ডলার আরও দুর্বল হতে পারে; অন্যদিকে, যদি মুদ্রানীতি কঠোর হয়, তবে মুদ্রার মান স্থিতিশীল হতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডলার এই বছর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং পরবর্তী বছরেও অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বজায় রয়েছে। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই মুদ্রা প্রবণতাকে কৌশলগতভাবে বিবেচনা করে ঝুঁকি হ্রাস ও সুযোগ সৃষ্টির জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে।



