ঢাকা হাইকোর্টের দুই বিচারপতি, মো. আশরাফুল কামাল ও কাজী ওয়ালিউল ইসলাম, ১ জানুয়ারি নিরাপদ পানীয় জলকে সংবিধানিক মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ ১৬ পৃষ্ঠার অনুলিপি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সকল নাগরিকের জন্য পরিষ্কার পানির নিশ্চয়তা নিয়ে আইনি ভিত্তি স্থাপন হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারকে নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহে দায়িত্বশীল হিসেবে গণ্য করা হবে।
হাইকোর্টের এই রায়ের পটভূমি ২০২০ সালে শুরু হয়, যখন আদালত স্বপ্রণোদিতভাবে একটি রুল জারি করে নিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য। রুলে আদালত স্পষ্টভাবে জানতে চেয়েছিল, রাষ্ট্র কি সকল নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা বহন করে, নাকি এই অধিকারকে মৌলিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় কিনা।
প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য হাইকোর্ট ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে চূড়ান্ত শুনানির আয়োজন করে। একই দিনে রায়ে আদালত স্পষ্ট করে জানায়, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া একটি মৌলিক অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তা আদালত রায়ে উল্লেখ করে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নিরাপদ পানীয় জলকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সরকারকে নীতি, পরিকল্পনা ও বাজেটের মাধ্যমে সবার জন্য পরিষ্কার জলের প্রবেশযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের আইনি স্বীকৃতি নাগরিকদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং ভবিষ্যতে পানীয় জলের মানদণ্ড নির্ধারণে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে।
সরকারি পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে কিছু ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। সরকার উল্লেখ করেছে, রায়ের ভিত্তিতে পানীয় জল উন্নয়ন প্রকল্পে তহবিল বরাদ্দ বাড়ানো এবং গ্রামীণ-শহুরে এলাকায় সমানভাবে পরিষ্কার জল সরবরাহের জন্য নতুন কর্মসূচি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কিছু বিশ্লেষক রায়ের বাস্তবায়নকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন, কারণ বিদ্যমান অবকাঠামো ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
অধিকন্তু, রায়ের ফলে রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন দিক যুক্ত হয়েছে। বিরোধী দলগুলো সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং রায়ের প্রয়োগে দেরি না করতে আহ্বান জানাচ্ছে। অন্যদিকে, ruling party-র কিছু সদস্য রায়কে দেশের উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরছেন, যা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে রায়ের প্রভাব স্পষ্ট। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে নিরাপদ পানীয় জলকে মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত করা হলে, ভবিষ্যতে এই অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নাগরিকরা আদালতে আবেদন করতে পারবেন। ফলে, সরকারকে ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখতে এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এই রায়ের পরবর্তী ধাপ হিসেবে হাইকোর্টের রুলের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করতে একটি তদারকি কমিটি গঠন করার সম্ভাবনা রয়েছে। কমিটি রায়ের কার্যকরীতা, তহবিলের ব্যবহার এবং পানীয় জলের গুণগত মানের ওপর নজর রাখবে। এছাড়া, স্থানীয় সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রাম-গ্রামে পরিষ্কার জল পৌঁছানোর জন্য কর্মসূচি চালু করা হতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, হাইকোর্টের এই রায় দেশের পানীয় জল নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিরাপদ পানীয় জলকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পেলে, নাগরিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক সমতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকার, বিচার বিভাগ এবং সমাজের সকল অংশীদারকে একসাথে কাজ করে রায়ের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রত্যেক বাংলাদেশীর জন্য পরিষ্কার ও নিরাপদ জল নিশ্চিত করা যায়।



