লুভ্র জাদুঘরের পরিচালক লরেন্স দে কার্স গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রনকে পদত্যাগের চিঠি জমা দেন। তিনি পারিসের এই বিশ্ববিখ্যাত জাদুঘরে সাম্প্রতিক গহনা চুরির পর দায়িত্বশীলতা প্রদর্শনের জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চুরি ঘটার দুই মাস পর এই পদত্যাগ জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে।
লরেন্স দে কার্সের পদত্যাগের ঘোষণায় ম্যাক্রন প্রেসিডেন্ট এটিকে “দায়িত্বের কাজ” বলে উল্লেখ করেন। সরকারী সূত্র জানায়, তিনি এই পদক্ষেপকে জাদুঘরের সুনাম রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করেছেন। দে কার্সের এই সিদ্ধান্তের পর জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ সমিতি দ্রুত নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়নের পরিকল্পনা শুরু করেছে।
চুরিটি ১৯ অক্টোবর গত বছর সকালে ঘটেছিল, যখন চোররা একটি চুরি করা গাড়ি-সংযুক্ত যান্ত্রিক লিফট ব্যবহার করে সাঁ নদের পাশে অবস্থিত গ্যালেরি দ্যাপলন (Galerie d’Apollon) এ প্রবেশ করে। তারা জাদুঘরের একটি ব্যালকনি থেকে সরাসরি গ্যালারিতে পৌঁছায়, যেখানে ফ্রান্সের মুকুট রত্ন সংরক্ষিত ছিল। এই পরিকল্পনা জটিল ছিল এবং নিরাপত্তা ক্যামেরার অপ্রতুলতা কাজে লাগিয়েছে।
চোরদের প্রধান চারজন সন্দেহভাজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারের পর তদন্তকারী দল তাদের সঙ্গে অতিরিক্ত সাক্ষাৎকারের জন্য আদালতে হাজির করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মামলাটি বর্তমানে ফ্রান্সের উচ্চ আদালতে চলমান, যেখানে অপরাধের বিশদ এবং দায়িত্বশীলদের শাস্তি নির্ধারণ করা হবে।
চুরির সময় আটটি মূল্যবান গহনা, যার মধ্যে একটি হীরার নেকলেস এবং একটি পন্না-হীরার মালা অন্তর্ভুক্ত, নেপোলিয়ন সম্রাটের স্ত্রীকে উপহার হিসেবে দেওয়া ছিল। এই রত্নগুলো ফ্রান্সের ঐতিহাসিক মুকুট রত্নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্প জগতের জন্য অমূল্য। চোররা এই রত্নগুলোকে গোপনে বহন করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
পালানোর পথে চোররা ১৯শ শতাব্দীর একটি হীরায় সজ্জিত মুকুট, যা সম্রাজ্ঞী ইউজেনিয়ের সম্পত্তি, ফেলে দেয়। মুকুটটি ভেঙে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা পুনরুদ্ধার করা যায়নি। এই ঘটনার ফলে ঐতিহাসিক সম্পদের ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
চুরির পর লুভ্র জাদুঘরের সীমানা ঘিরে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো দুর্বল এবং পুরনো বলে প্রকাশ পায়। বিশেষ করে গ্যালেরি দ্যাপলনের দিকে মুখ করা ব্যালকনি ক্যামেরা সম্পূর্ণই অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল, ফলে চোরদের প্রবেশের দৃশ্য রেকর্ড হয়নি। দে কার্স এই নিরাপত্তা ঘাটতি স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানান।
দে কার্স জাদুঘরের নিরাপত্তা বাজেটের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে ক্যামেরার সংখ্যা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বছরে ৮.৭ মিলিয়নেরও বেশি দর্শনার্থী আসার পরেও নিরাপত্তা অবকাঠামোতে যথেষ্ট বিনিয়োগ হয়নি। এই বাজেট সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
লুভ্র জাদুঘরের পরিচালক পদে দে কার্স ২০২১ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তার শাসনামলে জাদুঘর বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের আকর্ষণ করে এবং লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ‘মোনা লিসা’সহ অসংখ্য অমূল্য শিল্পকর্মের ঘরবাড়ি। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবহেলা তার নেতৃত্বের একটি বড় সমালোচনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সন্দেহভাজন চারজনের আদালতীয় শুনানি আগামী সপ্তাহে নির্ধারিত হয়েছে। বিচারক তাদের অপরাধের প্রমাণ, চুরি করা রত্নের বর্তমান অবস্থা এবং জাদুঘরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করবেন। পাশাপাশি, ফরাসি পুলিশ চুরি করা রত্নের পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা জানিয়েছে।
এই ঘটনার পর ফরাসি সরকার জাদুঘরের নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা করার সংকেত দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, উচ্চপ্রোফাইল চুরি ঘটনার পর জাদুঘরগুলোতে আধুনিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা অবিলম্বে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
লুভ্র জাদুঘরের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং দে কার্সের পদত্যাগের পরবর্তী নেতৃত্বের নির্বাচন জাদুঘরের কর্মী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে উদ্বেগের বিষয়। তবে জাদুঘরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মূল্য বিবেচনা করে দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা করা যায়।



