২০০৩ সালের ব্রিজবেনে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল ও ভারত ক্রিকেট দলকে অন্তর্ভুক্ত টেস্ট ম্যাচে সাচিন টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে দেওয়া এলবিডব্লিউ সিদ্ধান্ত আজও বিতর্কের বিষয়। সেই সময়ে ৪৯ বছর বয়সী ক্যারিবিয়ান উম্পায়ার স্টিভ বাকনর বল প্যাডে আঘাতের ভিত্তিতে ব্যাটারকে আউট ঘোষণা করেন। দুই দশকের বেশি সময়ের পর, ৭৯ বছর বয়সে বাকনর স্বীকার করেন যে সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।
বাকনর যখন সেই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন, অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের পেসার জেসন গিলেস্পি টেস্টের শেষ ওভারে টেন্ডুলকারের দিকে ডেলিভারি দেন। গিলেস্পির বল প্যাডে লেগে ব্যাটারকে শূন্য রানে ফেরত পাঠায়, তবে স্টাম্পের উপরে দিয়ে গিয়ে ব্যাটারকে আউটের দিকে ধাবিত হয়। উম্পায়ার দ্রুত হাত তুলেন এবং এলবিডব্লিউ সংকেত দেন, যা টেন্ডকারের মুখে হতাশা ফোটায়।
বাকনর সম্প্রতি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট উম্পায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনায় বলেন, “সাচিন টেন্ডুলকারকে এলবিডব্লিউ আউট দেওয়া ভুল ছিল। এখনও প্রতিদিন মানুষ এটি নিয়ে কথা বলে। আমি কেন তাকে আউট দিয়েছিলাম? সে কি আউট ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর আমি এখন জানি না, তবে ভুল হয়েছে এবং আমি তা মেনে নিয়েছি।” এই স্বীকারোক্তি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বিতর্কিত মুহূর্তকে পুনরায় আলোচনায় এনেছে।
ডেলিভারির পর টেন্ডুলকার প্রথমে অবাক হয়ে মাঠ ছেড়ে যান, তবে পরে শূন্য রানে ফেরেন। গিলেস্পি বলটি প্যাডে আঘাত করায় টেন্ডুলকারের প্যাডে ধাক্কা লেগে, ফলে ব্যাটে কোনো স্পর্শ না থাকলেও স্টাম্পের উপরে দিয়ে গিয়ে আউটের সংকেত দেয়া হয়। উম্পায়ারের দ্রুত সিদ্ধান্তের ফলে ম্যাচের প্রবাহে সাময়িক পরিবর্তন আসে, যদিও পরবর্তীতে টেন্ডুলকারের দলই ম্যাচ জিতে।
সেই সময়ের ইংরেজি ক্রিকেট অধিনায়ক টনি গ্রেগও এই সিদ্ধান্তকে “ভয়াবহ” বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেছিলেন, “এমন সিদ্ধান্তের ফলে খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয় এবং ম্যাচের ন্যায়বিচার প্রশ্নের মুখে পড়ে।” গ্রেগের মন্তব্য তখনই মিডিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং উম্পায়ারিং মানদণ্ডের ওপর নতুন আলো ফেলতে সাহায্য করে।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০০৩ সালে ড্রাইভ রিভিউ সিস্টেম (ডিআরএস) এখনও চালু ছিল না, ফলে উম্পায়ারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে থাকত। প্রযুক্তির অভাবে টেন্ডুলকারের মতো শীর্ষ ব্যাটসম্যানের বিরুদ্ধে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোতে পুনর্বিবেচনার সুযোগ না থাকায় বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়। আজকের দিনে ডিআরএসের উপস্থিতি এমন ভুলগুলোকে দ্রুত সংশোধন করতে পারে, তবে সেই সময়ে উম্পায়ারদের সিদ্ধান্তই শেষ কথা ছিল।
বাকনর ও টেন্ডুলকারের এই বিতর্কের পাশাপাশি, উম্পায়ারকে ঘিরে আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। ২০০৪-০৫ মৌসুমে ভারত ও পাকিস্তান দলের মধ্যে খেলা একটি ওয়ানডে ম্যাচে, আব্দুল রাজ্জাকের বল টেন্ডুলকারের ব্যাটে না লেগে কট বিহাইন্ড আউটের সংকেত দেন। রিভিউ দেখলে দেখা যায় বলটি ব্যাট স্পর্শ করেনি, তবু উম্পায়ার বাকনর আউটের সিদ্ধান্ত দেন, যা আবারও বিতর্কের জন্ম দেয়।
একবার টেন্ডুলকার বাকনরের সঙ্গে হাস্যকর কথোপকথনে মন্তব্য করেন, “যখন আমি ব্যাটিং করি, তখন তাকে বক্সিং গ্লাভস পরিয়ে দাও।” এই রসিকতা উম্পায়ার ও খেলোয়াড়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের একটি দিক প্রকাশ করে, যেখানে তীব্র প্রতিযোগিতার পাশাপাশি পারস্পরিক সম্মানও বজায় থাকে।
বাকনরের স্বীকারোক্তি এবং অতীতের বিতর্কগুলো উম্পায়ারিংয়ের মানবিক দিককে উন্মোচিত করে। তিনি ক্যারিয়ার জুড়ে ১২০টির বেশি টেস্ট ম্যাচ এবং একাধিক বিশ্বকাপে উম্পায়ার হিসেবে কাজ করেছেন, তবে কিছু সিদ্ধান্তই আজও স্মরণীয়। টেন্ডুলকারের এলবিডব্লিউ ভুল স্বীকার করা উম্পায়ারদের সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা ও দায়িত্ববোধের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উন্নত করা সম্ভব।



