বাংলাদেশের ফল বাজারে দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, যদিও ডলার সংকট কিছুটা শিথিল হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও ফল আমদানি করার সময় ১০০ শতাংশ নগদ মার্জিনের শর্ত আরোপ করেছে, যা লেটার অফ ক্রেডিট (LC) খোলার সময় সম্পূর্ণ শিপমেন্ট মূলধন নগদে জমা দিতে বাধ্য করে। এই নীতি সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়াচ্ছে।
ডলার সংকটের তীব্রতা কমে যাওয়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ চার বছর আগে যে নিম্ন স্তরে পৌঁছেছিল, তা থেকে উন্নতি হয়েছে। আগস্ট ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং রপ্তানি পারফরম্যান্সের উন্নতি মুদ্রা বাজারকে তরল করেছে। তবুও ফল আমদানি সংক্রান্ত কঠোর শর্ত বজায় রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২২ সালে দ্রুত হ্রাসমান বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের প্রেক্ষাপটে ১০০% নগদ মার্জিন নীতি প্রয়োগ করে। এর আগে ব্যাংকগুলো গ্রাহকের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে মার্জিন নির্ধারণ করত এবং আমদানিকর্তারা শিপমেন্টের কিছু অংশ অগ্রিম দিয়ে বাকি টাকা পরে পরিশোধ করতে পারত। এখন পুরো শিপমেন্টের মূল্য নগদে জমা দিতে হয়।
এই শর্তের ফলে আমদানিকর্তাদের নগদ সম্পদ লক হয়ে যায়, ফলে তারা অর্ডার কমিয়ে দেয়। সরবরাহের পরিমাণ হ্রাস পেলে বাজারে ঘাটতি দেখা দেয় এবং দাম বাড়ে। বিশেষত ফলের মতো দ্রুত ঘুরে বেড়ানো পণ্যের ক্ষেত্রে এই প্রভাব স্পষ্ট।
রিটেল বাজারে ফলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কমলার দাম এখন এক কিলোগ্রাম প্রতি টাকায় ৩৩০ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যেখানে ২০২২ সালে মার্জিন বাড়ার আগে দাম প্রায় ১৮০ টাকার কাছাকাছি ছিল। একইভাবে আপেলের দাম বর্তমানে ২৮০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে, যা ২০২২ সালের ২২০-২৮০ টাকার তুলনায় বেশি। আঙ্গুরের দাম ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে, পূর্বে ৪০০-৪৫০ টাকার সীমা ছিল। ট্যাংগারিনের দাম এখন প্রায় ৩২০ টাকার, আগের ২৫০-২৭০ টাকার তুলনায় উচ্চ।
ঢাকার এক গৃহিণী উল্লেখ করেছেন যে গত দুই-তিন বছরে ফলের দাম তীব্রভাবে বেড়েছে। তিনি স্থানীয় ফলের দিকে ঝুঁকতে চেষ্টা করলেও স্বাদ ও পছন্দের কারণে আপেল ও আঙ্গুরের মতো পণ্য বদলানো কঠিন। এই মূল্যবৃদ্ধি তার পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বাজার পর্যবেক্ষকরা জানান, ফলের দাম বাড়ার ফলে সুপারমার্কেট ও স্থানীয় বাজারে বিক্রয় কমে গেছে। আমদানিকর্তারা নগদ মার্জিনের কারণে শিপমেন্টের পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন, ফলে বাজারে প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভোক্তাদের জন্য বিকল্প কমিয়ে দেয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই নীতি চালু করার মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রক্ষা করা। তবে রিজার্ভের বর্তমান উন্নতি সত্ত্বেও নীতি পরিবর্তন না হলে ফলের দাম দীর্ঘমেয়াদে উচ্চই থাকবে। বিশেষত রেমিট্যান্স ও রপ্তানি প্রবাহে কোনো অস্থিরতা ফিরে এলে মুদ্রা বাজারে চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে যদি নগদ মার্জিনের শর্ত শিথিল না করা হয়, তবে ফলের দাম স্থিতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমদানিকর্তাদের নগদ প্রবাহের ওপর চাপ থাকলে তারা নতুন শিপমেন্টের পরিকল্পনা কমিয়ে দেবে, যা সরবরাহ সংকুচিত করে দাম আরও বাড়াবে।
ভবিষ্যতে নীতি পর্যালোচনা না হলে ফলের দাম উচ্চই থাকবে, এবং ভোক্তাদের জন্য বিকল্প কমে যাবে। এই পরিস্থিতি দেশীয় ফল উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা বাড়াবে, তবে তা তৎক্ষণাত মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে না। তাই বাজারের স্বাস্থ্যের জন্য নীতি সমন্বয় এবং মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতিশীলতা দুটোই গুরুত্বপূর্ণ।



