প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঙ্গলবার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে রুগ্ন ও বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশনা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বন্ধ কারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার শিল্পের পুনরুজ্জীবনে বেসরকারি পুঁজি ও দক্ষতার সংযোজনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পের পুনরায় খোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্যোগে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক, তবে অংশীদারিত্বের শর্তাবলী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সরকার এই শর্তগুলো স্পষ্ট করলে প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুততর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তারা কীভাবে মালিকানা ভাগ করবেন, বিনিয়োগের পরিমাণ কত হবে এবং পরিচালনায় কী ভূমিকা রাখবে ইত্যাদি বিষয়গুলো এখনও আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা দূর করতে সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও শিল্প সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সভা চালিয়ে যাচ্ছে। একবার কাঠামো নির্ধারিত হলে পুনরায় চালু হওয়া কারখানাগুলো দ্রুত উৎপাদন শুরু করতে পারবে।
বন্দি শিল্পের পুনরায় চালু করা বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরনো শ্রমিকদের কাজ বজায় রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ফলে শ্রমবাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং বেকারত্বের হার কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষত রুগ্ন পাটকল এবং বন্ধ চিনিকলগুলোকে পুনরায় চালু করে সেখানে পূর্বের শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা হবে। নতুন উৎপাদন লাইন যুক্ত করে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দেশের জুট ও চিনি শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে এই কারখানাগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে রপ্তানি সম্ভাবনা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা দুটোই পূরণ হতে পারে।
গত বছরের জুনে বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে মোট ৩৯৭টি বন্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল। এদের মধ্যে ৩৮২টি রুগ্ন বা বন্ধ শিল্প, পাঁচটি বিসিআইসির তত্ত্বাবধানে, ছয়টি বিএসএফআইসির তত্ত্বাবধানে এবং চারটি বিএসইসি’র অধীনে চিনিকল ও কারখানা অন্তর্ভুক্ত। এই সংখ্যা পূর্বের সরকারের সময় থেকে উল্লেখযোগ্য, যা শিল্পক্ষেত্রে অবহেলার ইঙ্গিত দেয়।
সেই পরিসংখ্যানের পর থেকে দুই বছর অতিবাহিত হওয়ায় বন্ধ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে, তবে হালনাগাদ তথ্য সরকার থেকে এখনও প্রকাশিত হয়নি। এই তথ্যের ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের পরিকল্পনা তৈরিতে কিছুটা বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সরকারকে দ্রুত আপডেটেড ডেটা প্রকাশ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বন্ধ ও রুগ্ন শিল্পের পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে প্রয়োজনীয় নীতি ও প্রণালী প্রণয়ন করবে। পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং শ্রম প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরির দায়িত্বও গ্রহণ করবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, বন্ধ শিল্পের পুনরায় চালু হওয়া উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে দেশীয় জিডিপি বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে এবং বেকারত্বের হার কমাতে সহায়তা করবে। তবে সফলতা নির্ভর করবে আর্থিক সহায়তা, দক্ষ শ্রমিকের প্রাপ্যতা এবং স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামোর উপর। সঠিক পরিকল্পনা ও তদারকি ছাড়া প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় খরচ ও দেরি হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যায়। তাই সরকারকে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করে সময়মতো সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুনরায় চালু হওয়া জুট ও চিনি কারখানাগুলো স্থানীয় কাঁচামাল চাহিদা বাড়িয়ে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি করতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে, যা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামা এবং মুদ্রা পরিবর্তনশীলতা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
সারসংক্ষেপে, রুগ্ন ও বন্ধ শিল্পের পুনরায় চালু করা দেশের শিল্প ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সফল বাস্তবায়নের জন্য স্পষ্ট অংশীদারিত্ব মডেল, পর্যাপ্ত তহবিল এবং কার্যকর তদারকি প্রয়োজন, যা দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উভয়ই নিশ্চিত করবে।



