দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সাউদি আরবের গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা রিজিয়া বেগমের পাঁচ বছর পর পরিবারে ফিরে আসা ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছে। ২০১৯ সালে তিনি একটি স্থানীয় ব্রোকার ও ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সাউদিতে গিয়েছিলেন। তিনটি সন্তানসহ তার পরিবার দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খবর না পেয়ে তাকে মৃত বলে ধারণা করেছিল।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আজকের দিনটি রিজিয়ার পরিবারে অল্প কথায় নয়, অশ্রুতে ভরা। তার মেয়ে লিজা আক্তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তিনি কথা বলেন না, কিন্তু তিনি জীবিত।” মেয়ে জানান, পরিবার একসময় রিজিয়াকে মৃত বলে স্বীকার করে নেয়ার পথে ছিল।
রিজিয়া যখন সাউদিতে পৌঁছান, তখনই তার নিয়োগকর্তা দ্বারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। লিজা উল্লেখ করেন, “শুরু থেকেই তিনি নিয়োগকর্তার হাতে কষ্ট পাচ্ছিলেন, আমরা বারবার ব্রোকার ও এজেন্সিকে জানিয়েছি, কোনো পরিবর্তন হয়নি।” ২০২১ সালের পর থেকে রিজিয়া ও তার পরিবারের মধ্যে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবার ২০২৩ সালে মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যু-তে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে, তবে রিজিয়ার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। লিজা বলেন, “আমরা ধীরে ধীরে সবচেয়ে খারাপের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম, বছর কেটে গেল, আর কোনো আশা বাকি না থাকল।” এই পরিস্থিতিতে পরিবার ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণ করেছিল।
ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে বিকাল ৪:৪৫ মিনিটে সাউদি এয়ারলাইনের একটি ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে একজন নারী যিনি নিজের নাম, ঠিকানা বা কোনো পরিচয়পত্র দিতে অক্ষম ছিলেন, তাকে সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি বিভাগের ওয়ারেন্ট অফিসার মাহবুব আলমের নজরে আসে। তিনি জানান, “নারীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা অস্থিতিশীল, তাই তাকে তৎক্ষণাৎ ব্র্যাকের কাছে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য হস্তান্তর করা হয়।”
ব্র্যাকের কর্মীরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে নারীর পরিচয় নির্ণয়ের চেষ্টা করে। তার ছবি ও তথ্য বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক নেটওয়ার্কে শেয়ার করা হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তার আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করে জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেসের সঙ্গে তুলনা করে।
ফিঙ্গারপ্রিন্টের মিলের মাধ্যমে রিজিয়া বেগমের পরিচয় নিশ্চিত হয়। তিনি মমদাননগর গ্রাম, বারলেখা, মৌলভীবাজারের বাসিন্দা। রিজিয়ার পরিবার যখন এই খবর শুনে, তখন অবিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে আনন্দের অশ্রু ঝরিয়ে দেয়।
ব্র্যাকের কর্মীরা রিজিয়াকে তৎক্ষণাৎ তার গ্রামে নিয়ে যায়। পরিবারে প্রথমে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেখা যায়, তবে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছেন। রিজিয়া এখনও নিজের নাম ও ঠিকানা স্মরণ করতে পারছেন না, তবে পরিবারের সহায়তায় তিনি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করছেন।
এই ঘটনার পর মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যু-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য এজেন্সি ও ব্রোকারদের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রস্তাব রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রিজিয়ার নিয়োগকর্তা ও মধ্যস্থতাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে।
পুলিশ ইতিমধ্যে রিজিয়ার নিয়োগকর্তা ও ব্রোকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তদন্তে দেখা যাবে যে, রিজিয়ার ওপর নির্যাতন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার পেছনে কী ধরনের অবৈধ কার্যকলাপ জড়িত ছিল।
পরিবারের মতে, রিজিয়া ফিরে আসার পরেও তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন। ব্র্যাকের সামাজিক সেবা দল তার জন্য মানসিক পরামর্শ ও পুনর্বাসন সেবা প্রদান করছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে কাজ করা নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। মানবসম্পদ, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যু-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে কঠোর নিয়মাবলি প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অবশ্যই, রিজিয়া বেগমের পুনরায় পরিবারে যুক্ত হওয়া একটি মানবিক সাফল্য, তবে তার ওপর আরোপিত কষ্টের দায়িত্বশীলদের বিচারের প্রয়োজন অব্যাহত থাকবে। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষ।



