লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রমজান মাসে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য দেখা গিয়েছে। মুসলিম শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায়ের জন্য ঐতিহাসিক লাল বড়দারি মসজিদে যাওয়ার চেষ্টা করলেও, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মসজিদটি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে নামাজের সময় মসজিদে প্রবেশ না পেয়ে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে নামাজ করতে বাধ্য হয়।
মসজিদটি প্রায় দুই শতাব্দী পুরনো এবং ১৮০০ সালে নবাব নাসিরুদ্দিন হায়দার নির্মাণ করেন। বর্তমানে এটি আর্কিওলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সংরক্ষিত স্থাপনা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, মসজিদ ও তার আশেপাশের বড়দারি কমপ্লেক্সে কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে এবং ভবনটি যেকোনো সময় ধসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই গেট বন্ধ করে ব্যারিকেড স্থাপন করা হয়েছে এবং ব্যাংক, ক্লাব, ক্যান্টিনসহ অন্যান্য সুবিধা খালি করতে বলা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। ২২ ফেব্রুয়ারি, রোববার, মসজিদ বন্ধের খবর শোনার পর কিছু মুসলিম শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে সমাবেশ করে বিক্ষোভ শুরু করে। বিক্ষোভের সময় নামাজের সময়সূচি আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা মসজিদ দরজার বাইরে একত্রে নামাজ আদায় করে।
বিক্ষোভের সময় পুলিশ উপস্থিত থাকায় শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন ছিল যে নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গৃহীত কোনো ব্যবস্থা তাদের নামাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই উদ্বেগ দূর করতে হিন্দু শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন গঠন করে মুসলিম সহপাঠীদের চারপাশে দাঁড়ায়। তারা শারীরিকভাবে গোষ্ঠী গঠন করে কোনো হস্তক্ষেপ না হওয়া পর্যন্ত নামাজ সম্পন্ন হতে দেয়।
এই মানববন্ধনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকের কাছ থেকে প্রশংসা পায়। অনলাইন ব্যবহারকারীরা এই ঘটনাকে সমন্বয় ও সহনশীলতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিছু মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা একে অপরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সম্মান বজায় রেখেছে।
মসজিদ বন্ধের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় একটি ব্যাখ্যা দেয়। তারা জানায় যে বড়দারি কমপ্লেক্সের ভিতরে বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোন ধরনের কার্যক্রম চলছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য প্রদান করা হয়নি।
শিক্ষার্থীদের মতে, মসজিদ বন্ধের আগে কোনো পূর্ব নোটিশ দেওয়া হয়নি, ফলে তারা নির্ধারিত সময়ে মসজিদে প্রবেশ করতে পারেনি। কিছু শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশ করে, মসজিদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের অংশ এবং দরজা সিল করে দেওয়া উচিত ছিল না, তা উল্লেখ করে দ্রুত পুনরায় খোলার দাবি জানায়।
প্রতাপগড়ী নামের একজন শিক্ষার্থী সামাজিক মাধ্যমে পোস্টে উল্লেখ করেন, “শতাব্দীপ্রাচীন এই মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের অংশ। শিক্ষার্থীদের না জানিয়ে দরজা ঝালাই করে সিল করা হয়েছে।” তিনি সঙ্গে সঙ্গে মসজিদটি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানান।
অধিকাংশ শিক্ষার্থী এই মানববন্ধনকে ধর্মীয় সহনশীলতার একটি শক্তিশালী উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় পূর্বে যথাযথভাবে জানিয়ে ব্যবস্থা নেবে, যাতে ধর্মীয় চর্চা বাধাগ্রস্ত না হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবিষ্যতে মসজিদটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করার জন্য কাঠামোগত মেরামত এবং নিরাপত্তা মূল্যায়ন করবে বলে জানিয়েছে। তবে মেরামত কাজের সময়সূচি এবং পুনরায় খোলার নির্দিষ্ট তারিখ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এই ঘটনার পর, ক্যাম্পাসের অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, সকল শিক্ষার্থীর ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং একইসাথে ঐতিহাসিক সম্পদের সংরক্ষণ নিশ্চিত করা তাদের অগ্রাধিকার।
শিক্ষার্থীদের জন্য এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে: ধর্মীয় পার্থক্য সত্ত্বেও পারস্পরিক সহায়তা ও সম্মান বজায় রাখলে সমন্বয়পূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। আপনি কি আপনার ক্যাম্পাসে এমন কোনো সমন্বয়মূলক উদ্যোগ দেখেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন এবং সহনশীলতা বাড়াতে কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করুন।



