বাংলাদেশ ব্যাংক শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগে তিনজন কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিস জারি করেছে। নোটিসে ১০ দিনের মধ্যে কারণ উপস্থাপন না করলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
নোটিসপ্রাপ্তদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ এবং নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা অন্তর্ভুক্ত।
প্রেস কনফারেন্সটি ১২ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিজিল অফিসের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানটি ১৬ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জরুরি পর্ষদ সভার আগে অনুষ্ঠিত হওয়ায় সময়ের সংবেদনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেন, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় জরুরি পর্ষদ সভা ডাকা স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের ওপর আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে, বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের জন্য নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে জোর দেন, কোনো ব্যক্তির একনায়কত্ব নয়। নওশাদ মোস্তফা যুক্তি দেন, ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো এ ধরনের উন্মুক্ততা দেখা যেত না। গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ ব্যাংক খাতে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য বন্ধ করে বাস্তব বিষয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
সংসদীয় নির্বাচনের পর নতুন প্রতিনিধিদের শপথ এবং সরকার গঠনের কাজ চলার সময়, বাংলাদেশ ব্যাংক ১৬ ফেব্রুয়ারি জরুরি পর্ষদ সভা ডেকেছিল। এই সভার মূল এজেন্ডা হিসেবে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স প্রদান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল, যা শিল্পে ব্যাপক আলোচনার বিষয়।
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন প্রক্রিয়া যদি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত দেয়, তবে ফিনটেক স্টার্টআপ ও বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার ন্যায়সঙ্গততা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। বাজারে এই ধরনের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার আস্থা কমাতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে এই বিতর্কের ফলে দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও শাসন কাঠামোর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। যদি নোটিসের ফলস্বরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনা পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে, যা নিয়ন্ত্রক নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তাছাড়া, ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন বিলম্বিত হলে ফিনটেক সেক্টরের তহবিল সংগ্রহ, গ্রাহক অধিগ্রহণ এবং সেবা সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।
শেয়ার বাজারে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে; ব্যাংকিং শেয়ারের মূল্য সাময়িকভাবে নিচের দিকে সরে গেছে এবং বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি মূল্যায়নে সতর্কতা অবলম্বন করছেন। আর্থিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, স্বচ্ছতা ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার না হলে দীর্ঘমেয়াদে সেক্টরের মূলধন প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বে কিছু সময়ে ব্যাংকগুলোর ভোটের প্রচার নির্দেশনা দিয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন তুলেছে। এই ধরনের পূর্বের পদক্ষেপগুলো এখন পুনরায় পর্যালোচনার মুখে, বিশেষ করে শাসন কাঠামোর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়েছে।
ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত কয়েকটি আবেদনকারীকে অপেক্ষমাণ অবস্থায় রেখেছে; বর্তমান বিতর্কের ফলে অনুমোদন সময়সূচি আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। লাইসেন্সের দেরি ফিনটেক কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পরিকল্পনা ও বাজারে প্রবেশের ক্যালেন্ডারকে প্রভাবিত করবে।
ফিনটেক স্টার্টআপগুলো বর্তমানে নগদহীন পেমেন্ট, মোবাইল ব্যাংকিং ইত্যাদি সেবা সম্প্রসারণে বিনিয়োগকারী তহবিলের উপর নির্ভরশীল; লাইসেন্সের অনিশ্চয়তা তহবিল সংগ্রহের খরচ বাড়াতে পারে এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পের বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই পরিস্থিতি সেক্টরের বৃদ্ধির গতি ধীর করতে পারে।
শাসন কাঠামোর স্বচ্ছতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণ নীতি পর্যালোচনা ও শৃঙ্খলা প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করতে পারে। এমন পদক্ষেপগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে নিয়ন্ত্রক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নোটিসে নির্ধারিত ১০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। ব্যাখ্যা ও পরবর্তী শৃঙ্খলা ব্যবস্থা কী হবে তা ব্যাংকের শাসন কাঠামো ও বাজারের আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে। পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন, যদি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, তবে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্সের অনুমোদন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক পথে ফিরে আসবে এবং আর্থিক খাতের উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে।



