ভারত এবং ফ্রান্স তিন দশকের পুরনো দ্বিপাক্ষিক করচুক্তি আপডেট করেছে। নতুন চুক্তিতে ফরাসি বিনিয়োগকারীদের জন্য ডিভিডেন্ড করের হার কমানো হয়েছে এবং দিল্লি সরকারকে শেয়ার বিক্রয়ের উপর ক্যাপিটাল গেইনসের কর আরোপের অধিকার প্রদান করা হয়েছে।
চুক্তি সংশোধনের বিস্তারিত তথ্য ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় সোমবার প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণার আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এম্যানুয়েল ম্যাক্রন ভারতের সফর শেষ করছিলেন, যেখানে দু’দেশের সম্পর্ককে “বিশেষ বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব” হিসেবে উঁচু করা হয় এবং প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়।
ডিভিডেন্ড করের ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম স্পষ্ট। ফরাসি কোম্পানি যদি কোনো ভারতীয় সংস্থায় কমপক্ষে ১০% শেয়ার ধরে রাখে, তবে তাদের ডিভিডেন্ডে ৫% কর আরোপ হবে, যা পূর্বের ১০% থেকে অর্ধেক কম। অন্যদিকে, ১০% এর কম শেয়ারধারী ফরাসি বিনিয়োগকারীদের জন্য করের হার ১৫% করা হয়েছে, যা পূর্বের ১০% থেকে বাড়ানো হয়েছে।
এই পরিবর্তন সরাসরি স্যানোফি, রেনল্ট এবং ল’রিয়েল মতো বড় ফরাসি কর্পোরেশনের ওপর প্রভাব ফেলবে, যেগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বাজারে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। ডিভিডেন্ড করের হ্রাস তাদের লাভের মার্জিন বাড়িয়ে তুলবে এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত মূলধন প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি করবে।
চুক্তিতে নতুন একটি ধারা যুক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে দিল্লি সরকার শেয়ার বিক্রয়ের ফলে সৃষ্ট ক্যাপিটাল গেইনসের উপর কর সংগ্রহের অনুমতি পাবে, এমনকি যদি ফরাসি সত্তা কোনো ভারতীয় কোম্পানির ১০% এর কম শেয়ারই ধরে রাখে। এই পদক্ষেপটি পূর্বে সীমাবদ্ধ ছিল এবং এখন বিনিয়োগের আকার নির্বিশেষে সকল লেনদেনে কর আরোপের সুযোগ দেবে।
একই সময়ে, চুক্তি থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদানকারী সর্বোত্তম জাতি (MFN) ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে। পূর্বে এই ধারা ফরাসি সত্তাগুলোকে ভারতের কর কাঠামোতে বিশেষ রেট দাবি করার সুযোগ দিত। MFN ধারা অপসারণের পেছনে ২০২৩ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের প্রভাব রয়েছে, যেখানে এই ধারা দেশের স্বায়ত্তশাসন ও কর নীতির সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
ডেটা অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ফ্রান্সের বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১৫.৬ বিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের অংশীদারিত্ব রাখে। এই বিনিয়োগের মধ্যে ফার্মাসিউটিক্যাল, অটোমোবাইল এবং কসমেটিক্স সেক্টরের বড় বড় কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত। একই সময়ে, দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্য গত বছর প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার পরিমাণে সম্পন্ন হয়েছে।
ডিভিডেন্ড করের হ্রাস বড় ফরাসি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য আয় বাড়াবে, ফলে ভারতীয় ইকুইটি বাজারে অতিরিক্ত বিদেশি মূলধনের প্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে ছোট শেয়ারহোল্ডারদের জন্য করের হার বাড়ার ফলে কিছুটা বিনিয়োগের আকর্ষণ কমতে পারে, বিশেষ করে যারা কম শেয়ার ধরে রাখে। সামগ্রিকভাবে, এই পরিবর্তন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
চুক্তি উভয় দেশের আইনগত অনুমোদন ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর কার্যকর হবে। কর নীতি পরিবর্তনের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা হবে, বিশেষ করে ক্যাপিটাল গেইনসের কর সংগ্রহের প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়ে। ভবিষ্যতে ফরাসি কোম্পানিগুলো ভারতীয় বাজারে নতুন প্রকল্প ও উৎপাদন সুবিধা স্থাপনের সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, এই করচুক্তি সংশোধন ভারত-ফ্রান্সের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আর্থিক দিক থেকে আরও মজবুত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ডিভিডেন্ড ও ক্যাপিটাল গেইনসের কর কাঠামোতে পরিবর্তন উভয় দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশকে স্বচ্ছ ও পূর্বাভাসযোগ্য করে তুলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে সহায়তা করবে।



