চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকায় সোমবার ভোরে গ্যাস লিকেজের ফলে গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার ফলে তিনজনের মৃত্যু এবং ছয়জনের গুরুতর দাহজনিত আঘাত হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটার পর টানা দুই দিন পর, স্বাস্থ্য মন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু রাজধানীর ন্যাশনাল বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে (NBPSI) রোগীদের অবস্থা জানার জন্য উপস্থিত হন।
বিস্ফোরণটি হালিশহরের এইচ ব্লকের এসি মসজিদ সংলগ্ন হালিমা মঞ্জিল নামের ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার রান্নাঘরে গ্যাস লিকেজের ফলে ঘটেছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিস্ফোরণটি সকাল ৪ টার কাছাকাছি ঘটেছিল, ফলে ভবনের কাঠামো ধসে পড়ে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিস্ফোরণে নিহত তিনজনের মধ্যে ৪০ বছর বয়সী নূর জাহান আক্তার রানি, একই বয়সের সামির আহমেদ সুমন এবং ১৬ বছর বয়সী শাওন অন্তর্ভুক্ত। তাদের মৃত্যু দাহজনিত আঘাতের তীব্রতার কারণে নিশ্চিত করা হয়েছে।
দগ্ধ রোগীদের তালিকায় ৪৬ বছর বয়সী শাখাওয়াত হোসেন, ৩০ বছর বয়সী শিপন, ৭ বছর বয়সী আনাস, ৯ বছর বয়সী আইমান, ৪ বছর বয়সী আয়েশা আক্তার এবং ৩৫ বছর বয়সী পাখি আক্তার অন্তর্ভুক্ত। পাখি আক্তার ও শাখাওয়াত হোসেনের দেহ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে গিয়ে শারীরিক অবস্থা অতি গুরুতর, অন্যদেরও দাহজনিত আঘাতের কারণে তীব্র ব্যথা ও শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন।
মন্ত্রীরা মঙ্গলবার সকাল প্রায় দশটায় NBPSI-তে পৌঁছান। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল দগ্ধ রোগীদের বর্তমান চিকিৎসা অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং হাসপাতালের পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা। উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নাসির উদ্দীন, যিনি মন্ত্রীদেরকে রোগীদের চিকিৎসা পরিকল্পনা ও চলমান সেবা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন।
ডা. নাসির উদ্দীন জানান, দগ্ধ রোগীদের জন্য তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা এবং ত্বক প্রতিস্থাপনসহ বহু ধরণের বিশেষায়িত সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে রোগীদের অধিকাংশই তীব্র দাহজনিত শক, শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতি এবং ত্বকের গভীর ক্ষতির কারণে ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি। চিকিৎসা দল রোগীদের পুনরুদ্ধার সম্ভাবনা বাড়াতে আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারি ও পুনর্বাসন প্রোগ্রাম চালু করেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “একই পরিবারের নয়জন দগ্ধের ঘটনা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছি এবং রোগীদের পরিবারকে আশ্বস্ত করছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “প্রতিটি রোগীর জন্য ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, যাতে শারীরিক ও মানসিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।”
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু একই সময়ে জানান, “প্রতি বছর মানবসৃষ্ট দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। আজ সকালে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আরেকটি গ্যাস বিস্ফোরণ ঘটেছে, ফলে অতিরিক্ত আহত হয়েছে।” তিনি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোর করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে দগ্ধ রোগীদের জন্য সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সরবরাহ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সব রিসোর্স দ্রুত সরবরাহ করা হবে। রোগীদের পরিবারকে ধৈর্য ধরতে এবং চিকিৎসা প্রক্রিয়ার প্রতি বিশ্বাস রাখতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং গ্যাস সরবরাহের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাবকে আবারো সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা গ্যাস লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়মিত লিকেজ চেক এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার গুরুত্ব পুনরায় জোর দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ দুঃখজনক ঘটনা রোধ করা যায়।



