২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ পিলখানা গার্ডে বিস্ফোরক ধ্বংসাত্মকভাবে ফেটে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা প্রাণ হারান। দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা গ্যারান্টি থাকা স্থানে এই রক্তপাতের পর থেকে মামলাটি বহু বছর ধরে বিচারিক জটিলতায় আটকে আছে। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো এই মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
পিলখানা হামলা তখন বাংলাদেশ রিফলস (বিডিআর) গার্ডের প্রশিক্ষণভূমিতে সংঘটিত হয়, যেখানে একাধিক বিস্ফোরক একসাথে ফাটিয়ে ৫৭ জন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারকে শোকের মধ্যে ফেলে দেয়। এই ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু হয়, তবে প্রমাণ সংগ্রহ ও সাক্ষী সনাক্তকরণে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
মামলাটি বিস্ফোরক আইনের অধীনে দায়ের করা হয় এবং এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৮শ’ জনের বেশি আসামি তালিকাভুক্ত হয়েছে। মোট ১২০০ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র তিনশ’ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সাক্ষীর জবানবন্দিতে শেখ হাসিনা, শেখ তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং তৎকালীন বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতার নাম উঠে এসেছে।
প্রসিকিউশনের প্রধান, চিফ প্রসিকিউটর বোরহান উদ্দিন জানান, জবানবন্দিতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উল্লেখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিস্ফোরক মামলায় প্রমাণের পরিমাণ ও সাক্ষীর সংখ্যা বিবেচনা করে তদন্তের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বিস্ফোরক মামলায় এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়নি; বিচার প্রক্রিয়া এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে কয়েকশ’ আসামি জামিন পেয়েছেন, তবে অধিকাংশ সন্দেহভাজন এখনও জেলখানায় রয়েছেন।
২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর উচ্চ আদালত প্রথম রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ জনকে আজীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে। হাইকোর্টের পরবর্তী রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বজায় রাখা হয়, ১৮৫ জনকে আজীবন কারাদণ্ড এবং ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড নিশ্চিত করা হয়। মোট ২৮৩ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এই রায়ের পর থেকে মামলাটি বহু আপিল ও পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে চলমান রয়েছে। আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন প্রমাণ ও সাক্ষীর জবানবন্দি উপস্থাপিত হওয়ায় মামলাটির জটিলতা বাড়ছে।
শেখ হাসিনার প্রথমবারের মতো অভিযুক্ত হওয়া দেশের রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি এখন পর্যন্ত কোনো অপরাধমূলক মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন না, তাই এই পদক্ষেপটি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক মনোযোগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মামলাটির পরবর্তী ধাপ হিসেবে আদালতকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জারি করা এবং প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায় প্রদান করতে হবে। বিচারিক প্রক্রিয়ার গতি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি অতিরিক্ত সাক্ষী সংগ্রহ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলো বহু বছর ধরে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। তারা দাবি করে, সকল সংশ্লিষ্টকে আইনের আওতায় আনা হলে শোকের ক্ষত কিছুটা হলেও সেরে উঠবে।
বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ও আসামিদের অবস্থা সম্পর্কে সরকারী সূত্র থেকে জানানো হয়েছে যে, ভবিষ্যতে মামলাটির চূড়ান্ত রায়ের জন্য বিশেষ আদালতে দ্রুততর শোনানির ব্যবস্থা করা হবে। এই পদক্ষেপটি দেশের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করবে।
মামলাটির বর্তমান অবস্থা ও আসামিদের তালিকা প্রকাশের পর থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মামলার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানাচ্ছেন। সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত রায়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।



