ডাক বিভাগের মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদে বিদেশি মূলধন আনতে প্রস্তাব নিয়ে জামায়াত-এ-ইসলামির ঢাকা-১৪ আসনের এমপি ব্যারিস্টার আরমান মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বিনিয়োগের মূল শর্ত ও সম্ভাব্য দেশের নাম প্রকাশ না করে, প্রথমিক আলোচনা শেষ হওয়ার পর বিস্তারিত জানাবেন বলে ইঙ্গিত দেন।
ব্যারিস্টার আরমান ১৩তম সংসদের সদস্য, যিনি যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর পুত্র। তার রাজনৈতিক পরিচয় এবং আইনজীবী পেশা তাকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগের জন্য স্থানীয় এজেন্টের ভূমিকা নিতে সহায়তা করছে।
মিটিংয়ে আরমান উল্লেখ করেন, বিদেশি সংস্থা নগদে মূলধন ঢুকিয়ে পরিচালনায় অংশ নেবে এবং তিনি তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিরূপে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আলোচনা প্রাথমিক স্তরে এবং গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের পরই পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে।
বিনিয়োগকারী দেশ বা এজেন্টের পরিচয় সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট তথ্য দেননি। এ ধরণের গোপনীয়তা বিনিয়োগের গঠন ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের আগে স্বাভাবিক বলে তিনি যুক্তি দেন।
গত বছরের ২৫ আগস্ট, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর নগদকে ডাক অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেসরকারি খাতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনা জানান।
মনসুরের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়, নগদের মালিকানা আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে বেসরকারি সংস্থার হাতে হস্তান্তর করা হবে। পোস্ট অফিসের সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে নগদ চালানোর জন্য নতুন অংশীদার প্রয়োজনীয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নাগদ ২৬ মার্চ ২০১৯ সালে মোবাইল আর্থিক সেবা হিসেবে চালু হয় এবং পরে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পায়। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত গ্রাহক ভিত্তি গড়ে তুলেছিল এবং দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পূর্বে আওয়ামী লীগের শাসনকালে নগদকে নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে অনৈতিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছে বলে সমালোচনা উঠে আসে। এই অভিযোগগুলো প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও নিয়ন্ত্রক তদারকিতে প্রভাব ফেলেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২১ আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশ ব্যাংক নগদে প্রশাসক নিয়োগ করে, তবে উচ্চ আদালত পরে এই পদক্ষেপকে অবৈধ ঘোষণা করে। আদালতের রায়ের পর ডাক অধিদপ্তর নগদের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। মামলায় সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকসহ ২৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল ২০২৪ পর্যন্ত নগদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে, বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংকের ‘ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট’ হিসেবে ইস্যু করা ই-মানি নিয়ে তদন্ত চালায়। এই পর্যবেক্ষণ নগদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেয়।
বিদেশি মূলধনের সম্ভাব্য প্রবেশ নগদের শেয়ারহোল্ডার কাঠামো ও সেবা বিস্তারে নতুন দৃষ্টিকোণ আনতে পারে, তবে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি বাড়বে। বিনিয়োগের শর্ত, দেশীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সামঞ্জস্য নিশ্চিত না হলে ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাজারের দৃষ্টিতে, নগদে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমোদন হলে ডিজিটাল পেমেন্ট সেক্টরে প্রতিযোগিতা তীব্র হবে এবং গ্রাহক সেবার মান উন্নত হতে পারে। তবে আইনগত বিরোধ ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা দূর না হলে বিনিয়োগকারীর আস্থা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়ে যায়।
পরবর্তী সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আরমানের বৈঠকের ফলাফল প্রকাশিত হবে, যা নগদের মালিকানা হস্তান্তর ও নতুন মূলধন প্রবাহের সময়সূচি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিনিয়োগের দেশ, শর্ত এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিস্তারিত জানার সঙ্গে সঙ্গে বাজারের প্রতিক্রিয়া গঠন করবে।



