ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর অধীনে নির্মিত মহাসাগরগামী যুদ্ধজাহাজ ‘শহিদ মাহদাভি’ ৫৭ দিনের দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক মিশন শেষ করে ইরানের আঞ্চলিক জলের সীমায় ফিরে এসেছে। মেহের নিউজের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে অনুষ্ঠিত ব্রিকস জোটের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশগ্রহণের পর আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলীরেজা তাংসিরির নেতৃত্বে স্বাগত জানানো হয়।
অ্যাডমিরাল তাংসিরি স্বাগত অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নির্দেশনা অনুসারে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ় সংকল্প নিয়ে বিশ্ব মহাসাগরে উপস্থিত থাকতে প্রস্তুত। এই বক্তব্য ইরানের সামরিক নীতি ও কূটনৈতিক লক্ষ্যকে স্পষ্ট করে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা ক্ষেত্রে তার উপস্থিতি বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করে।
‘শহিদ মাহদাভি’ আইআরজিসি নৌবাহিনীর অষ্টম যুদ্ধজাহাজ হিসেবে এই মিশনে অংশ নেয় এবং ১০৩তম নৌবহরের অন্তর্ভুক্ত। জাহাজটি প্রায় ১০,৭০০ নটিক্যাল মাইল, অর্থাৎ প্রায় ১৮,০০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে, যা ইরানের সামুদ্রিক ক্ষমতার পরিসরকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। মিশনের সময় জাহাজটি প্রথমবারের মতো দক্ষিণ গোলার্ধ এবং আটলান্টিক মহাসাগরে নৌ অভিযান পরিচালনা করে, যা ইরানের নৌ কৌশলগত অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
যুদ্ধজাহাজের শারীরিক বৈশিষ্ট্যও নজরকাড়া। ২,১০০ টন ওজনের ‘শহিদ মাহদাভি’ ২৪০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২৭ মিটার প্রস্থের, এবং ২০২৩ সালের মার্চে আইআরজিসি নৌবহরে যুক্ত হয়। জাহাজে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পরিসরের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে, যা দীর্ঘ দূরত্বে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। এছাড়া, এটি বিপুল সংখ্যক নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন বহন করতে পারে, যা সমুদ্র থেকে সমুদ্র এবং সমুদ্র থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা প্রদান করে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে, ‘শহিদ মাহদাভি’তে ত্রিমাত্রিক ফেজড অ্যারো রাডার, আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা এবং উন্নত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সিস্টেম সংযুক্ত রয়েছে। এই সিস্টেমগুলো জাহাজকে শত্রু রাডার ও সিগন্যাল শনাক্তকরণে সক্ষম করে, পাশাপাশি সমুদ্রের ওপর ও নিচে বিভিন্ন হুমকির মোকাবিলায় সহায়তা করে। জাহাজটি বিভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার, যুদ্ধ ড্রোন এবং দ্রুতগতির আক্রমণকারী নৌযান বহন করার ক্ষমতাও রাখে।
ব্রিকস জোটের যৌথ নৌ মহড়ায় অংশগ্রহণ ইরানের আন্তর্জাতিক নৌ উপস্থিতি সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের অংশগ্রহণ ইরানকে দক্ষিণ গোলার্ধের সমুদ্র পথে কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দেয়, যা পূর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রভাবের সীমা বাড়িয়ে দেয়।
কূটনীতিকরা ইরানের এই নৌ উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তনের সূচক হিসেবে দেখছেন। তারা বলেন, ইরান যখন মহাসাগরীয় ক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নৌ নীতি ও নিরাপত্তা কৌশল পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, ইরানের এই মিশনটি গালফের তেল রুট এবং হিন্দু মহাসাগরের বাণিজ্যিক পথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করে।
ইরানের সামরিক পরিকল্পনায় এই মিশনকে একটি মাইলস্টোন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে ‘শহিদ মাহদাভি’র পরবর্তী মিশনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা আফ্রিকান উপকূল এবং আটলান্টিকের অন্যান্য কৌশলগত বন্দরকে অন্তর্ভুক্ত করবে। এই পরিকল্পনা ইরানের নৌ বাহিনীর বহুমুখী অপারেশনাল রেঞ্জ বাড়াতে এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা আলোচনায় তার স্বরকে শক্তিশালী করতে লক্ষ্য রাখে।
ইরানের নৌ বাহিনীর এই অগ্রগতি অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নজরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ বাহিনী ইতিমধ্যে ইরানের সমুদ্র কার্যক্রমকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ নীতি সমন্বয় গোষ্ঠীও ইরানের সামুদ্রিক উপস্থিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে, ইরানের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, এই নৌ শক্তি বৃদ্ধিকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করছে। তারা ইরানের সামুদ্রিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের প্রতি সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি কমে।
সামগ্রিকভাবে, ‘শহিদ মাহদাভি’র সফল মিশন ইরানের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশলে একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা করে। এটি ইরানকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র ক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, এবং ভবিষ্যতে আরও বহুমুখী নৌ অপারেশন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা উন্মুক্ত করে। এই মিশনের পরবর্তী ধাপগুলো ইরানের নৌ নীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সমুদ্র শাসনে কী প্রভাব ফেলবে, তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।



