বাংলাদেশে খেজুরের সরবরাহের মূল উৎসের পরিবর্তন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মোট আমদানির ৭৩ শতাংশ ইরান থেকে এবং প্রায় ২২ শতাংশ সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসত; বাকি তিনটি দেশ মিলিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ অবদান রাখত। তবে আজকের বাজারে এই চিত্র আর সম্পূর্ণ সঠিক নয়।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, সারা বছর খেজুরের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বাজারে বৈচিত্র্যের চাহিদা নতুন সরবরাহকারীকে সুযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যদিও শেয়ার এখনও তুলনামূলকভাবে ছোট। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী খেজুর উৎপাদনে শীর্ষ বিশের মধ্যে অবস্থান করে এবং ২০২৪ সালে ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (FAO) অনুসারে ৩৭টি দেশে মোট প্রায় ১ কোটি টন উৎপাদন হয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন প্রায় ৫৬,০০০ টন, যা বিশ্বে ১৮তম স্থানে।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথম খেজুরের শিপমেন্ট ১৮ অক্টোবর ২০১৫-এ ঘটেছিল। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩১৪ কেজি ডেলিভারি করা হয় এবং তা ঢাকার মিরপুরের সামিয়া এন্টারপ্রাইজে পৌঁছায়। একই অর্থবছরে মোট পাঁচটি শিপমেন্টে ৮৪৪ কেজি খেজুর দেশের বাজারে প্রবেশ করে।
এরপর থেকে আমদানি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। রোজা মাসের আগে, জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৪৭,০০০ কেজি খেজুর ঢাকায় পৌঁছায়। এই লোড তিনটি শিপমেন্টে উত্তরা ফ্রুটসের মাধ্যমে আনা হয় এবং মোট খরচ প্রায় ৭৯,০০০ ডলার, যার মধ্যে শুল্ক ও করসহ মোট প্রায় দুই কোটি টাকা। এক কেজি খেজুরের জন্য আমদানিকারককে প্রায় ১৯০ টাকা শুল্ক দিতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা মূলত ক্যালিফোর্নিয়ার ‘মেডজুল’ প্রকারের খেজুর। এই প্রজাতি আকারে বড় এবং স্বাদে সমৃদ্ধ, ফলে বাজারে আলাদা মূল্যমান পায়। গত দশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট প্রায় ৩,১৩,০০০ কেজি খেজুর বাংলাদেশে আমদানি করা হয়েছে।
খেজুর আমদানিকারক মিনহাজ এন্টারপ্রাইজের প্রধান রাইসুল ইসলাম জানান, মেডজুলের বড় আকারের কারণে এর চাহিদা আলাদা এবং দামও তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এই প্রকারের খেজুরের জন্য বিশেষায়িত বিক্রয় চ্যানেল গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় বিক্রেতা ও রিটেইলার জন্য নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের খেজুর রপ্তানি গন্তব্যের তালিকায় বাংলাদেশ পূর্বে উল্লেখযোগ্য না থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই তালিকায় তার অবস্থান বাড়ছে। এই প্রবণতা নির্দেশ করে যে বাংলাদেশি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমানের খেজুরের চাহিদা বাড়ছে।
বাজারে বৈচিত্র্য আনা মানে শুধুমাত্র উৎসের পরিবর্তন নয়, বরং মূল্য কাঠামোও পরিবর্তিত হচ্ছে। মেডজুলের উচ্চমূল্য অন্যান্য প্রকারের তুলনায় বেশি, ফলে মোট গড় দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে, শুল্ক ও পরিবহন খরচের বৃদ্ধি শেষ গ্রাহকের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন ক্ষমতা এবং গুণগত মানের কারণে সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হচ্ছে। এটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করে, যা বাজারের অস্থিরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের খেজুরের চাহিদা বর্তমান গতিতে বৃদ্ধি পায়, তবে আগামী দুই-তিন বছরে আমদানি পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনা নির্ভর করবে শুল্ক নীতি, লজিস্টিক খরচ এবং স্থানীয় ভোক্তাদের পছন্দের ওপর।
সারসংক্ষেপে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে খেজুরের ঐতিহ্যবাহী নির্ভরতা হ্রাস পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো নতুন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তন বাজারে বৈচিত্র্য, উচ্চমানের পণ্য এবং মূল্য পরিবর্তনের নতুন গতিপথ তৈরি করছে, যা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে উভয়ই সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করছে।



