মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত এ এবং যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ গত সপ্তাহে বাণিজ্য নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার গ্রীষ্মে সম্পন্ন একটি চুক্তির অনুমোদন স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানায়, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একই সময়ে ১৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এই পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন উল্লেখ করেছে যে, গ্রীষ্মে স্বাক্ষরিত চুক্তির অনুমোদন প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত স্থগিত থাকবে, ফলে চুক্তির চূড়ান্ত রূপায়ণ এখনো অনিশ্চিত। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনি পরিবর্তনগুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারত এ একই সময়ে জানিয়েছে যে, পূর্বনির্ধারিত আলোচনার সময়সূচি পরিবর্তন করে চুক্তি চূড়ান্ত করার জন্য নির্ধারিত বৈঠকগুলো স্থগিত করা হবে। এভাবে ভারত এও শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নের জন্য অতিরিক্ত সময় চাচ্ছে।
ট্রাম্প এই পরিস্থিতি ব্যবহার করে গত সপ্তাহে সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্টে উল্লেখ করেন যে, বাণিজ্যিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা দেশগুলোকে সতর্ক করা দরকার। তিনি যুক্তি দেন যে, পূর্বের বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
গত শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৭৭ সালের আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (International Emergency Economic Powers Act) এর অধীনে ট্রাম্পের ঘোষিত বৈশ্বিক শুল্ক বাতিল করে। এই রায়ের ফলে পূর্বে ঘোষিত শুল্কের আইনি ভিত্তি অচল হয়ে যায়।
কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প একটি ভিন্ন আইনের অধীনে নতুন শুল্ক ব্যবস্থা প্রয়োগের ঘোষণা দেন। প্রথমে ১০% শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করা হয়, তবে তা দ্রুত ১৫% পর্যন্ত বাড়িয়ে মঙ্গলবার থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেন। এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী পণ্যের মূল্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলবে।
অনেক দেশ ট্রাম্পের প্রাথমিক শুল্ক ঘোষণার পর তাদের আলোচনার অবস্থা সম্পর্কে অনিশ্চিততা প্রকাশ করেছে। তারা উল্লেখ করে যে, শুল্কের হ্রাসের প্রত্যাশা এবং বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি তাদের বাণিজ্যিক কৌশলের মূল অংশ ছিল।
বিভিন্ন দেশ শুল্ক কমিয়ে পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়াতে চেয়েছিল, যাতে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বা আমেরিকান প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সহজ করার মতো সুবিধা পাওয়া যায়। এই প্রেক্ষাপটে নতুন শুল্কের উচ্চতা তাদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাজ্যও একই সময়ে জানিয়েছে যে, তারা মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে চাপের লাইন চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে শুল্কের হার ১৫% এর নিচে থাকলে চুক্তি বজায় থাকবে কিনা তা নিশ্চিত করা যায়। যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য জরুরি বলে বিবেচিত হচ্ছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিটির সভাপতি বার্নড ল্যাঞ্জ উল্লেখ করেন যে, জুলাই মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক অনুমোদিত চুক্তির অনুমোদন ইতিমধ্যে স্থগিত করা হয়েছিল। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি পূর্বের চেয়ে আরও অনিশ্চিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার রবিবার এবিসি নিউজকে জানিয়ে বলেন যে, তারা চুক্তি পুনর্গঠনের নতুন উপায় খুঁজে পেয়েছে। এই মন্তব্যটি নতুন শুল্ক নীতি এবং চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য।
বিশ্ববাজারে এই ধারাবাহিক পরিবর্তন শুল্কের বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের ব্যাঘাত এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। রপ্তানি-আমদানি সংস্থাগুলো এখন নতুন শুল্ক কাঠামোর সাথে মানিয়ে নিতে অতিরিক্ত খরচ এবং সময়ের মুখোমুখি।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন যে, যদি শুল্কের হার আরও বাড়ে বা চুক্তি পুনরায় আলোচনার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা দিতে পারে। তাই দেশগুলোকে শুল্ক নীতি ও বাণিজ্যিক চুক্তির পুনর্মূল্যায়নে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
বিবিসি অনুসারে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশে এই নতুন গতিবিধি ভবিষ্যতে আরও জটিল আলোচনার সূচনা করতে পারে, এবং দেশগুলোকে কৌশলগতভাবে তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।



