রাশিয়া ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে ইউক্রেনের উপর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ হিসেবে চিহ্নিত হয়। চার বছর পর, যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং মানবিক ক্ষতি উভয় দেশের জন্য গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহর, যেমন বাকমুট, টোরেস্ক এবং ভোচান্স্ক, ধারাবাহিক লড়াইয়ের ফলে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে। এই নগরগুলোর অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ও পুনর্গঠনকে কঠিন করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২২ সাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ২,৮০০টিরও বেশি আক্রমণ নথিভুক্ত করেছে। একই সময়ে, রাশিয়ার বিদ্যুৎ ও গ্যাস নেটওয়ার্কে আক্রমণ লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে, যা শীতকালে বিশেষভাবে বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছে।
জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এলাকা মাইন বা অমীমাংসিত বোমার কারণে বিপন্ন। এই মাইনফিল্ডগুলো এখনও নাগরিকদের চলাচলকে সীমাবদ্ধ করে এবং পুনর্নির্মাণের কাজকে ধীর করে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, পরবর্তী দশকে ইউক্রেনের পুনর্নির্মাণের মোট খরচ প্রায় ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এই বিশাল আর্থিক চাহিদা দেশের অবকাঠামো, বাসস্থান এবং মৌলিক সেবা পুনরুদ্ধারের জন্য জরুরি তহবিলের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে ১৫,০০০টিরও বেশি বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তবে রাশিয়ার দখলকৃত মারিয়ুপোলের মতো এলাকায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ইউক্রেনের সীমান্তে রাশিয়ার ওপর করা প্রতিক্রিয়ামূলক আক্রমণও উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটিয়েছে, যেখানে শত শত রাশিয়ান নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সংঘর্ষের জটিলতা এবং উভয় পক্ষের নাগরিকদের উপর প্রভাবকে তুলে ধরে।
কিয়েভের অনুমান অনুযায়ী, রাশিয়ান দখলকৃত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড থেকে প্রায় ২০,০০০ শিশুকে জোরপূর্বক স্থানান্তর করা হয়েছে বা অপহরণ করা হয়েছে। এই শিশুদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ বাড়ছে।
রাশিয়া আক্রমণের ফলে প্রায় ৫.৯ মিলিয়ন ইউক্রেনীয় শরণার্থী বিদেশে বসতি স্থাপন করেছে, আর অতিরিক্ত ৩.৭ মিলিয়ন মানুষ দেশের ভিতরে অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত হয়েছে। এই বিশাল শরণার্থী প্রবাহ মানবিক সহায়তার চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে।
সামরিক ক্ষতির সঠিক সংখ্যা উভয় পক্ষই প্রকাশ করে না। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সম্প্রতি জানিয়েছেন যে তার বাহিনীর ৫৫,০০০ সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে, যা বাস্তব সংখ্যার চেয়ে কম হতে পারে।
রাশিয়া সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে সামরিক ক্ষতির কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে ব্রিটিশ সেবা এবং স্বাধীন রাশিয়ান মিডিয়া মিডিয়াজোনার তথ্য অনুযায়ী, সর্বনিম্ন ১,৭৭,০০০ রাশিয়ান সৈন্যের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
এই চার বছরের সংঘর্ষের ফলে ইউক্রেনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর রাশিয়ার আন্তর্জাতিক অবস্থানও উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। উভয় দেশই এখন পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের পথে অগ্রসর হতে চায়, যদিও শর্তাবলি জটিল।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনো প্রধান চ্যালেঞ্জ হল মানবিক সাহায্য পৌঁছানো, মাইন পরিষ্কার করা এবং শরণার্থীদের নিরাপদ পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে, দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তি ও রাজনৈতিক সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ত্বরান্বিত করা জরুরি।
পরবর্তী সময়ে, যুদ্ধের অবশিষ্ট অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং শরণার্থীদের পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য।



