স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন দিন পর, গত শুক্রবার নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলায় অবস্থিত হাফিজপুর গ্রামে নিজের বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে অংশ নেন। তিনি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তৃতি ও নাগরিকের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এই সভা অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
মন্তব্যের মধ্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চিকিৎসককে রোগীর পেছনে ঘুরতে না দিয়ে, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরে সেবা প্রদান করবে। তিনি সহজলভ্য ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নীতি চালু করার কথা উল্লেখ করেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাক্তারদের বাড়িতে গিয়ে সেবা প্রদান করা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
মন্তব্যের পর বিভিন্ন বিশ্লেষক ও নাগরিকের মধ্যে মতবৈষম্য দেখা যায়। কেউ এটিকে স্বাস্থ্যখাতের বাস্তব চিত্র হিসেবে স্বীকার করেন, আবার অন্যরা চিকিৎসকদের ভূমিকা হ্রাসের ইঙ্গিত হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই বৈচিত্র্যময় প্রতিক্রিয়া স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক, যিনি বহু বছর ধরে স্বাস্থ্য মানবসম্পদ নিয়ে গবেষণা করছেন, নতুন সরকারের জন্য কিছু মূল পদক্ষেপ প্রস্তাব করেন। তিনি বর্তমান মানবসম্পদ তথ্যপদ্ধতিকে আধুনিকায়ন এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার গুরুত্ব উল্লেখ করেন। এই ব্যবস্থা কর্মী নিয়োগ ও বরাদ্দে স্বচ্ছতা বাড়াবে।
প্রস্তাবিত তথ্যভান্ডারটি জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার, সহকারী স্বাস্থ্যকর্মী, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণে সহায়তা করবে। রুমানা হক বলেন, সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে শূন্যপদ চিহ্নিত করে তৎক্ষণাত পদস্থাপন করা সম্ভব হবে, যা স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গ্রামীণ এলাকায় ডাক্তার ধরে রাখার জন্য তিনি পদোন্নতির মানদণ্ডে গ্রামসেবা অন্তর্ভুক্ত করার পরামর্শ দেন। যদি প্রমোশন ও বেতন বৃদ্ধিতে গ্রামীণ পোস্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে চিকিৎসকরা দূরবর্তী অঞ্চলে কাজ করতে বেশি আগ্রহী হবে। এই প্রণালী কর্মী রিটেনশন ও সেবা মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য মাত্র সাতজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। নিকটবর্তী ভারতের ও শ্রীলঙ্কার অনুপাত যথাক্রমে প্রায় দশ ও বারোজন, ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা মানে ফাঁক দেখা দেয়। নার্সের সংখ্যা তাও ততটাই কম, যা রোগীর যত্নে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
বছরের পর বছর ধরে মানবসম্পদ সংকট স্বাস্থ্যখাতে অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দেন, সীমিত কর্মীসংখ্যায় গুণগত সেবা প্রদান করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও কর্মী ধরে রাখার জন্য সমন্বিত নীতি প্রণয়ন জরুরি, যাতে সেবা মানের অবনতি রোধ করা যায়।
মন্ত্রীর পরিকল্পনায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক ও মোবাইল ইউনিট চালু করার কথা রয়েছে। এই উদ্যোগগুলো রোগীর দরজায় সেবা পৌঁছানোর লক্ষ্য রাখে, তবে সঠিক কর্মীসংখ্যা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া কার্যকারিতা সীমিত থাকবে। তাই কর্মী ঘাটতি সমাধান না হলে এই প্রকল্পের প্রভাব কমে যাবে।
ডেটা‑ভিত্তিক পরিকল্পনার গুরুত্ব রুমানা হক পুনরায় জোর দেন। একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় তথ্যসিস্টেমের মাধ্যমে শূন্যপদ, অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা ও কর্মী পারফরম্যান্স ট্র্যাক করা সম্ভব হবে। এই তথ্য নীতি নির্ধারকদের সঠিক সময়ে সম্পদ বরাদ্দে সহায়তা করবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাবে।
প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার, এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কাজ প্রয়োজন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে নতুন ডাক্তার ও নার্সের সুষ্ঠু প্রবাহ নিশ্চিত করা, পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা উচিত। আন্তঃসংস্থা সহযোগিতা দ্রুত শূন্যপদ পূরণে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, স্বাস্থ্যসেবার পৌঁছানো বাড়ানো এবং মানবসম্পদ শক্তিশালী করা দুটোই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যভান্ডার গঠন, গ্রামীণ পদোন্নতি নীতি এবং জরুরি নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যকর হলে দেশের স্বাস্থ্যখাতের কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। এখন প্রশ্ন রয়ে যায়, সরকার কত দ্রুত এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবে রূপান্তরিত করতে পারবে।



