ব্যাংক এশিয়া গত আর্থিক বছরের শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করে উল্লেখযোগ্য ফলাফল অর্জন করেছে। প্রচলিত ঋণ পুনঃতফসিলের পাশাপাশি গ্রাহকদের ব্যবসা বিক্রিতে সহায়তা, খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা সহ একাধিক কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়ায় ব্যাংকটি বন্ধকি ও লিয়েন রাখা সম্পদ, পাশাপাশি ঋণগ্রহীতাদের মালিকানাধীন জমি ও কোম্পানির শেয়ার বাজেয়াপ্ত করেছে। এই পদক্ষেপগুলো ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক দায়িত্বের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে তুলেছে এবং পুনরুদ্ধারযোগ্য সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করেছে।
ফলস্বরূপ, ব্যাংক এশিয়া বছরের শেষে ১,৯১৩ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফা রেকর্ড করেছে। বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, কর-পরবর্তী মুনাফা এই ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে, ব্যাংকটি নিরাপত্তা সঞ্চয় সম্পূর্ণ রূপে সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছে, যা আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত প্রায় ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা তার আর্থিক স্থিতিশীলতা ও শক্তিশালী অবস্থানকে নির্দেশ করে। প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতি সত্ত্বেও, ঋণ-আমানত অনুপাত ৬০ শতাংশের নিচে বজায় রয়েছে, যা তারল্য এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দৃঢ় ভিত্তি প্রকাশ করে।
ব্যাংকের ব্যয়-আয় অনুপাতের উন্নতি পরিচালন দক্ষতার স্পষ্ট সূচক। খরচের তুলনায় আয় বৃদ্ধি পেয়ে ব্যয়-আয় অনুপাত কমে এসেছে, যা কার্যকরী ব্যবস্থাপনা ও খরচ নিয়ন্ত্রণের ফলাফল। একই সময়ে, বিদেশি শাখা ও আন্তর্জাতিক লেনদেন থেকে অর্জিত আয়ও ইতিবাচকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর. হুসেইন উল্লেখ করেছেন, ২০২৪ সালে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, তবে ব্যাংক আর্থিক প্রতিবেদনকে কৃত্রিমভাবে উন্নত করার পথে অগ্রসর হয়নি। অনেক ঋণ জামানতবিহীন ছিল, ফলে দীর্ঘমেয়াদী পুনঃতফসিলের পরিবর্তে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করা হয়। এই পদ্ধতি ঋণ আদায় এবং ঋণের গুণগত মান উভয়ই উন্নত করেছে।
অন্যান্য ব্যাংকগুলো সাধারণত কেবল আইনি মামলা ও চেক প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ সংগ্রহে নির্ভর করে। তবে এ ধরনের পদ্ধতি প্রায়ই গ্রাহকের নগদ প্রবাহ ও পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনা না করে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুনঃতফসিলের দিকে ধাবিত হয়, যা পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তোলে। আদালতের স্থগিতাদেশের ফলে ঋণ আদায়েও বাধা সৃষ্টি হয়।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে ব্যাংক এশিয়া নতুন কৌশল প্রয়োগ করে খেলাপি ঋণ সংগ্রহে অগ্রগতি অর্জন করেছে। দীর্ঘদিনের গ্রাহক যেমন আবদুল মোনেম শুগার রিফাইনারি ও রবিনটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যবসা বিক্রির সহায়তা এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকের এই বহুমুখী পদ্ধতি শিল্পে একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঋণ পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি, ব্যাংকটি গ্রাহকদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সমর্থন করে তাদের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ফলে, ঋণগ্রহীতাদের পুনরায় ঋণ গ্রহণের সম্ভাবনা কমে এবং ব্যাংকের ঝুঁকি কমে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ব্যাংক এশিয়ার এই কৌশল ভবিষ্যতে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। খেলাপি ঋণ হ্রাসের মাধ্যমে ব্যাংকের মূলধন গঠন শক্তিশালী হবে এবং শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্ন বাড়বে। একই সঙ্গে, আমানতকারীদের আস্থা বজায় থাকবে, যা তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করবে।
তবে, বহুমুখী কৌশলের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। সম্পদ বাজেয়াপ্তের ফলে গ্রাহকের ব্যবসা বন্ধ হতে পারে, যা অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, ব্যাংকের উচিত ঋণগ্রহীতাদের পুনর্গঠন ও পুনরায় ব্যবসা চালু করার জন্য সহায়তা প্রোগ্রাম চালু করা।
সারসংক্ষেপে, ব্যাংক এশিয়া খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন উপায়ে সমস্যার সমাধান করেছে। এর ফলে পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধি, মূলধন পর্যাপ্ততা উন্নতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয়েছে। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা হলে, ব্যাংক সেক্টরে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও লাভজনকতা বাড়বে বলে ধারণা করা যায়।



